ছবি: রয়টার্স

হাসিনাকে নিয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রেস বিজ্ঞপ্তি ঢাকা থেকে দিল্লিকে কী বার্তা দিচ্ছে?

Share

তিনতন্ত্রের সমকালীন বিশ্লেষণ: পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ৫ আগস্ট প্রকাশিত এই প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জুলাই অভ্যুত্থানকে “জুলাই বিপ্লব” এবং শেখ হাসিনাকে “গণহত্যাকারী” আখ্যা দেওয়া ছাড়াও ভূ-রাজনীতি, কূটনীতি ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক অবস্থান সংক্রান্ত আরও বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে এসেছে।

২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানকে এখানে আনুষ্ঠানিকভাবে “জুলাই বিপ্লব” হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে এবং নিহতদের “শহীদ” মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। এটি নিছক ভাষাগত প্রকাশ নয়—রাষ্ট্রীয় দলিলে এই স্বীকৃতি আন্দোলনকে ঐতিহাসিক ও সাংবিধানিক বৈধতা দেওয়ার একটি ধাপ।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রেস বিজ্ঞপ্তি
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রেস বিজ্ঞপ্তি

হাসিনাকে শুধু রাজনৈতিক ভাষায় নয়, আইনি পরিভাষায় “পলাতক দণ্ডপ্রাপ্ত গণহত্যাকারী” ও “mass murderer” বলা হয়েছে, তার শাসনব্যবস্থাকে “fascist regime” ও “mafia enterprise” হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। শিশুসহ নিরপরাধ বেসামরিক মানুষ হত্যার বিষয়টি জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠিত তথ্যের রেফারেন্স দিয়ে জোর দেওয়া হয়েছে—অর্থাৎ এই অভিযোগ শুধু ঢাকার নিজস্ব বয়ান নয়, আন্তর্জাতিক সংস্থার তথ্যের ওপর ভিত্তি করে দাঁড় করানো।

ভারতের মাটিতে দাঁড়িয়ে হাসিনার মিডিয়ার সাথে যোগাযোগকে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের প্রতি সরাসরি আঘাত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে, যা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করার প্রচেষ্টার জন্য চরম ক্ষতিকর বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

২০১৩ সালের বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তির অধীনে হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর অনুরোধ জানানো সত্ত্বেও ভারতের পক্ষ থেকে কোনো সাড়া না পাওয়ার বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করা হয়েছে। এটি নিছক অভিযোগ নয়, বরং আন্তর্জাতিক চুক্তিগত বাধ্যবাধকতা লঙ্ঘনের ইঙ্গিত।

বিজ্ঞপ্তিতে স্পষ্ট বলা হয়েছে, বাংলাদেশ আর কখনো কোনো দেশের আজ্ঞাবহ রাষ্ট্র বা Client state হবে না এবং সার্বভৌম সমতা ও পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে পররাষ্ট্রনীতি পরিচালনা করবে। এই বাক্যাংশ কার্যত অতীতের ভারত-নির্ভর পররাষ্ট্রনীতি থেকে সরে আসার একটি স্পষ্ট ঘোষণা।

সাধারণত রাষ্ট্রীয় প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে প্রতিবেশী রাষ্ট্র বা তাদের ভূখণ্ডে অবস্থানরত কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে “genocider”, “mass murderer”, “mafia enterprise”-এর মতো শব্দ প্রয়োগ বিরল। কূটনৈতিক রীতিতে সাধারণত পরোক্ষ ভাষা ও সংযত সমালোচনার চর্চা হয়। কিন্তু এখানে ভাষা এতটাই তীক্ষ্ণ যে এটি প্রায় অভিযোগনামার কাছাকাছি চলে গেছে। এটি নির্দেশ করে, ঢাকা দিল্লির ওপর তাদের ক্ষোভ চেপে রাখছে না এবং সম্পর্ক পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে ভারতকে নতুন বাস্তবতা মেনে নেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে।

আবার অতীতে হাসিনা সরকারের আমলে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে “সোনালি অধ্যায়” হিসেবে তুলে ধরা হতো। বর্তমান বিবৃতিতে তার সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র—সম্পর্ককে শর্তসাপেক্ষ, সমতাভিত্তিক ও লেনদেননির্ভর হিসেবে পুনর্সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে।

জুলাই বিপ্লবের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে এমন কড়া আন্তর্জাতিক প্রেস রিলিজ দেওয়া শুধু বিদেশের জন্য নয়, দেশের ভেতরের জনগণের আবেগ ও আকাঙ্ক্ষারও প্রতিফলন। তৎকালীন ‘ফ্যাসিবাদী’ রাজনৈতিক ব্যবস্থার সাথে সম্পূর্ণ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা এবং সেই শাসনের পুনরাবৃত্তি আর না হতে দেওয়ার জাতীয় প্রতিশ্রুতি এখানে দৃঢ়ভাবে পুনঃব্যক্ত করা হয়েছে।

বিজ্ঞপ্তিটি প্রকাশ করে, ভারতের ভূখণ্ডে বসে হাসিনার রাজনৈতিক মন্তব্য বা উপস্থিতি বাংলাদেশকে ক্ষুব্ধ করছে এবং তা দুই দেশের ঐতিহাসিক সম্পর্কে নতুন ধরনের টানাপোড়েন সৃষ্টি করছে। সার্বভৌম সমতা, হস্তক্ষেপ বন্ধ এবং প্রত্যর্পণ চুক্তির বাস্তবায়ন ছাড়া দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক স্বাভাবিক হওয়া কঠিন—এই বার্তাই বিজ্ঞপ্তির মূল বক্তব্য।

সবমিলিয়ে এই বিবৃতিতে একযোগে তিনটি লক্ষ্য সাধিত হয়েছে—অভ্যন্তরীণ জনসেন্টিমেন্টের প্রতিফলন, ভারতের ওপর কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে হাসিনা-বিরোধী অবস্থান নথিভুক্ত করে রাখা। প্রত্যর্পণ চুক্তির প্রসঙ্গ টেনে আনা এই বার্তাকে নিছক রাজনৈতিক বিবৃতির সীমা ছাড়িয়ে আইনি মাত্রাও দিয়েছে, যা ভবিষ্যতে কূটনৈতিক বা আইনি ফোরামে চাপ প্রয়োগের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে।