ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কন্যা সায়মা ওয়াজেদ পুতুল আওয়ামী লীগের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী পর্ষদ প্রেসিডিয়ামে যুক্ত হতে যাচ্ছেন। ক্ষমতাচ্যুতির দুই বছরেরও বেশি সময় পর দলটির সাংগঠনিক পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে এই উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।
দলের একাধিক জ্যেষ্ঠ নেতা জানিয়েছেন, হাসিনার সম্ভাব্য দেশে ফেরা এবং দলের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব নিয়ে আলোচনার মধ্যেই আওয়ামী লীগকে পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিচ্ছেন তিনি। এই প্রক্রিয়ার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন পুতুল, এবং তাকে প্রেসিডিয়ামে মনোনীত করার প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে বলে জানান নেতারা। তাদের ভাষ্যমতে, চলতি মাসেই এই মনোনয়ন চূড়ান্ত হতে পারে।
পুনর্গঠন প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে শুক্রবার দলের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির একটি সভা আহ্বান করা হয়েছে। সভাটি প্রাথমিকভাবে নয়াদিল্লিতে সরাসরি উপস্থিত হয়ে আয়োজনের পরিকল্পনা থাকলেও বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নেতারা তা ভার্চুয়ালি আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেন।
শুধু পুতুলই নন, প্রেসিডিয়ামে চট্টগ্রাম বিভাগ ও বরিশাল বিভাগ থেকে একজন করে নেতাকে অন্তর্ভুক্তির বিষয়েও আলোচনা চলছে বলে জানা গেছে। আওয়ামী লীগের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী, কাউন্সিল বা কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে দলীয় সভাপতি প্রেসিডিয়াম সদস্যদের মনোনীত করে থাকেন।
একাধিক নেতা জানান, শুক্রবারের সভাতেই পুতুলের মনোনয়ন চূড়ান্ত নাও হতে পারে। কার্যনির্বাহী কমিটি যদি দলীয় সভাপতি হিসেবে হাসিনাকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা দেয়, তাহলে তিনি আগামী ২২ সেপ্টেম্বর পরিবারের সদস্য ও জ্যেষ্ঠ নেতাদের সঙ্গে পরামর্শ করে মনোনয়ন চূড়ান্ত করতে পারেন।
দলটি প্রাথমিকভাবে ভারতে কেন্দ্রীয় নেতাদের সরাসরি একত্র করার পরিকল্পনা করলেও শেষ মুহূর্তে তা পরিবর্তন করে। এর একটি কারণ হলো, কেন্দ্রীয় কমিটির সব সদস্য বর্তমানে ভারতে অবস্থান করছেন না। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে অবস্থানরত একাধিক নেতা প্রস্তাবিত সভার কথা জেনে ইতোমধ্যে দিল্লিতে পৌঁছেছেন, পাশাপাশি মৌসুমি ইনফ্লুয়েঞ্জা নিয়ে উদ্বেগের বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে।
আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নিশ্চিত করেছেন যে তারা দিল্লিতে পৌঁছেছেন। বর্তমানে দিল্লিতে অবস্থানরত অন্য নেতাদের মধ্যে রয়েছেন প্রেসিডিয়াম সদস্য জাহাঙ্গীর কবির নানক ও এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটন, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবুল আলম হানিফ ও এএফএম বাহাউদ্দিন নাসিম, সাংগঠনিক সম্পাদক বিএম মোজাম্মেল হক, এসএম কামাল হোসেন, মির্জা আজম, শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল ও সুজিত রায় নন্দী। এছাড়া অর্থ ও পরিকল্পনা বিষয়ক সম্পাদক ওয়াসিকা আয়েশা খান, আইন বিষয়ক সম্পাদক নজিবুল্লাহ হিরু, তথ্য ও গবেষণা বিষয়ক সম্পাদক সেলিম মাহমুদ, দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া, উপ-দপ্তর সম্পাদক সায়েম খান, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সম্পাদক মৃণাল কান্তি দাস, সাংস্কৃতিক বিষয়ক সম্পাদক অসীম কুমার উকিল এবং সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলও সেখানে রয়েছেন।
কেন্দ্রীয় কমিটির এক সদস্য জানান, বাংলাদেশ-ভারতের মধ্যকার বিভিন্ন দ্বিপাক্ষিক ইস্যুর কারণে দিল্লিতে আওয়ামী লীগের কার্যক্রমের বিস্তারিত প্রকাশ না করতে নেতাদের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, এর পেছনে কৌশলগত বিবেচনাও থাকতে পারে।
দলের শীর্ষ নেতৃত্বে পুতুলের প্রবেশের সম্ভাবনা হাসিনার ক্ষমতায় থাকাকালীন উত্থাপিত উত্তরাধিকার প্রশ্নকে আবারও সামনে নিয়ে এসেছে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে সরকার পতনের পর হাসিনা তার বোন শেখ রেহানাকে সঙ্গে নিয়ে ভারতে চলে যান। পুতুল তখন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থায় (ডব্লিউএইচও) কর্মরত অবস্থায় নয়াদিল্লিতেই ছিলেন, তবে বর্তমানে তিনি আর সেই পদে নেই।
হাসিনা ঘোষণা দিয়েছেন যে আগামী ডিসেম্বরে তিনি বাংলাদেশে ফিরে আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করছেন। তার এই সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তন ও আইনি জটিলতার আশঙ্কা দলের মধ্যে এই প্রশ্নও উসকে দিয়েছে যে, হাসিনা কারাবন্দি হলে দলের নেতৃত্ব কে দেবেন। এই প্রেক্ষাপটে জ্যেষ্ঠ নেতারা জানান, আওয়ামী লীগ পুনর্গঠন এবং পুতুলকে সক্রিয় রাজনীতিতে নিয়ে আসার বিষয়ে আলোচনা জোরদার হয়েছে। নেতাদের দাবি, পুতুলের সম্ভাব্য রাজনৈতিক ভূমিকাই ছিল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে তার সরে দাঁড়ানোর মূল কারণ।