পাহাড়ধসে নিহত দুই ছেলের ছবি হাতে বাদল দত্ত। গতকাল শুক্রবার রাঙামাটির ভেদাভেদী এলাকায়। ছবি: প্রথম আলো

রাঙামাটি পাহাড়ধসের ৯ বছর: স্বজন হারানোর বেদনা আজও বুকে, ঝুঁকি কমেনি পাহাড়ে

Share

‘ছেলেদের লাশ দুটো যখন কাঁধে নিলাম, মনে হলো পাহাড়টাই আমার কাঁধে উঠে গেছে।’ কথাগুলো বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন রাঙামাটির ভেদভেদী এলাকার বাসিন্দা বাদল দত্ত। ২০১৭ সালের ১৩ জুনের সেই ভয়াবহ পাহাড়ধসে তিনি হারিয়েছিলেন দুই ছেলেকে। আজ শনিবার সেই বিভীষিকার ৯ বছর পূর্ণ হচ্ছে।

সেদিন ভোর সাড়ে পাঁচটা থেকে ছয়টার মধ্যে বিকট শব্দে ঘুম ভাঙে বাদল দত্তের। পাশের পাহাড় ধসে পড়েছিল তাঁর ঘরের ওপর। সেনাবাহিনীর সহায়তায় কোনোরকমে বেরিয়ে আসেন তিনি ও তাঁর স্ত্রী। তবে বড় ছেলেকে পাওয়া যায় দুই দিন পর, ছোট ছেলেকে তিন দিন পর—দুজনেই নিথর। স্ত্রী ভুলু রানী এখনো সেই শোক থেকে বেরিয়ে আসতে পারেননি।

ওই দুর্যোগে শুধু রাঙামাটিতেই প্রাণ হারান ১২০ জন, তার মধ্যে শহরেই ৭৩ জন। বৃহত্তর চট্টগ্রামে মোট নিহতের সংখ্যা ছিল ১৫৮। রাঙামাটিতে ১৪২টি স্থানে পাহাড়ধস হয়েছিল, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল প্রায় ছয় হাজার ঘরবাড়ি ও ৮৩টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছিল প্রায় ২০০ কোটি টাকা। সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল, মূল মহাসড়ক স্বাভাবিক হতে সময় লেগেছিল দুই মাসের বেশি। উদ্ধার কাজ চলাকালে আবার পাহাড়ধসে দুই কর্মকর্তাসহ পাঁচ সেনাসদস্য প্রাণ হারান।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় উঠে এসেছে, অতিবৃষ্টি এই দুর্যোগের তাৎক্ষণিক কারণ হলেও পাহাড় কাটা, বন উজাড়, অপরিকল্পিত বসতি ও জনসংখ্যার অতিরিক্ত চাপ মিলিয়ে বিপদ আরও ভয়াবহ হয়েছিল।

নয় বছর পেরিয়ে গেলেও পরিস্থিতির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়নি। রাঙামাটি পৌরসভায় এখনো ২৯টি ঝুঁকিপূর্ণ ঢাল চিহ্নিত রয়েছে। ২০১৭ সালের আগে পশ্চিম মুসলিম পাড়ায় পরিবার ছিল ২০টি, এখন তা বেড়ে ৬০টি হয়েছে। মামলা-জরিমানা করেও পাহাড় কাটা থামানো যাচ্ছে না।

গবেষক অধ্যাপক মো. ইকবাল সরোয়ার বলেন, পাহাড় কাটা ও বন উজাড় বন্ধ করতে হবে, আধুনিক প্রযুক্তিতে ঝুঁকিপূর্ণ স্থান চিহ্নিত করতে হবে এবং পাহাড়ধসকে জাতীয় দুর্যোগ নীতিমালায় অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। অন্যদিকে ভেদভেদী পশ্চিম মুসলিম পাড়ার বাসিন্দা আবদুল কুদ্দুস, যিনি সেদিন স্ত্রীকে হারিয়েছিলেন, বলেন বর্ষায় টানা বৃষ্টি হলেই আতঙ্ক ভর করে—তবু ঘর ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে পারেন না।

  • প্রথম আলো অবলম্বনে