ছবি : সংগৃহীত

শাহজালালে কারিগরি ত্রুটির জেরে বদ্ধ বিমানে ১৮২ যাত্রীর দুর্বিষহ পাঁচ ঘণ্টা

Share

 

কারিগরি ত্রুটির কারণে ঢাকা থেকে কলম্বোগামী একটি ফ্লাইট নির্ধারিত সময়ের সাড়ে পাঁচ ঘণ্টা পর ছাড়ায় হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দুর্বিষহ অভিজ্ঞতার মুখে পড়েছেন ১৮২ জন যাত্রী। গত ১১ জুলাই ফিটস এয়ারের এই ফ্লাইটটি (৮ডি ০৯১২) রাত ২টা ১৫ মিনিটে ছাড়ার কথা থাকলেও তা ছাড়ে সকাল ৭টা ৫০ মিনিটে, আর এই পুরো সময় যাত্রীদের বসিয়ে রাখা হয় বদ্ধ উড়োজাহাজের ভেতরেই।

যাত্রীদের অভিযোগ, দীর্ঘ সময় আটকে থাকার কারণে অনেকেই শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন, অথচ এই সময়ে তাঁদের খাবার বা অন্য কোনো প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হয়নি। উল্টো কয়েকজন যাত্রীর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করা হয়েছে বলেও অভিযোগ তাঁদের। তবে শাহজালাল বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষ প্রাথমিকভাবে জানায়, এ ধরনের কোনো অভিযোগ তাদের কাছে আসেনি। অন্যদিকে ফিটস এয়ারের এক মুখপাত্র বিলম্বের জন্য নিজেদের দায় অস্বীকার করলেও দুর্ব্যবহারের অভিযোগ প্রসঙ্গে সরাসরি কোনো জবাব দেননি।

উল্লেখ্য, কোনো ফ্লাইটে কারিগরি ত্রুটি দেখা দিলে মেরামতের জন্য যাত্রীদের নামিয়ে আনার বাধ্যবাধকতা সাধারণত থাকে না, তবে দীর্ঘ বিলম্বের ক্ষেত্রে প্রচলিত আন্তর্জাতিক চর্চায় সাধারণত যাত্রীদের নামিয়ে আনা হয়ে থাকে।

যাত্রীদের বর্ণনায় দুঃসহ অভিজ্ঞতা

ফ্লাইটের যাত্রী ও নারী পর্যটক সংগঠন গো গার্লসের সহপ্রতিষ্ঠাতা সোনিয়া রিফাত জানান, চেক-ইন থেকে বিমানে ওঠা পর্যন্ত পুরো প্রক্রিয়াই ছিল বিশৃঙ্খল, আর এয়ারলাইনসের কর্মীদের আচরণও ছিল অপেশাদার। তাঁর ভাষ্যে, বিমানে ওঠার পরপরই কারিগরি ত্রুটির কথা জানানো হলেও সমাধানের সম্ভাবনা না থাকা সত্ত্বেও যাত্রীদের ভেতরেই আটকে রাখা হয়। শ্বাসকষ্টে ভুগে বারবার অসুস্থতার কথা জানালেও তাঁকে নামার অনুমতি দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ করেন সোনিয়া। সকাল সাড়ে সাতটার আগে কোনো খাবার সরবরাহ না করায় শিশু ও বয়স্ক যাত্রীরা সংকটে পড়েন বলেও জানান তিনি। এ ছাড়া যাত্রা বাতিল করতে চাওয়া যাত্রীদের সঙ্গে রূঢ় আচরণ এবং এক টিম সদস্যের দিকে জোরপূর্বক ব্যাগ ছুড়ে মারার অভিযোগও করেন তিনি। শ্রীলঙ্কায় পৌঁছানোর পর অসুস্থতার কারণে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয় তাঁকে, যার প্রমাণ হিসেবে চিকিৎসাপত্রও দেখান তিনি। এই অভিজ্ঞতার পর গো-গার্লস সংগঠনটি ভবিষ্যতে ফিটস এয়ারের সঙ্গে কোনো ট্যুর পরিচালনা না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

আরেক যাত্রী মেহরীন রহমানের জন্য এটি ছিল জীবনের প্রথম একক ভ্রমণ, যা এই ঘটনার কারণে দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছিল বলে জানান তিনি। শেষ পর্যন্ত কলম্বো যাওয়ার আগেই বিমান থেকে নেমে যান তিনি। মেহরীন জানান, বিমানে কোনো খাবার বা পানীয়ের ব্যবস্থা ছিল না, যা দীর্ঘ সময় অপেক্ষারত অনেক যাত্রীর জন্য, বিশেষ করে নিয়মিত খাবার প্রয়োজন হয় এমন ডায়াবেটিক রোগীদের জন্য কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়।

এয়ারলাইনসের ব্যাখ্যা

ফিটস এয়ারের মুখপাত্র পরিচয় দেওয়া এক ব্যক্তি জানান, তাঁদের ফ্লাইট মাত্র ৪৫ মিনিট বিলম্বিত হয়েছিল, তবে ওই সময় শাহজালাল বিমানবন্দরে রানওয়ে সংস্কারকাজ চলায় এবং পরবর্তীতে বৈরী আবহাওয়া ও এভিয়েশন ওয়ার্নিংয়ের কারণে ফ্লাইট উড্ডয়ন করতে পারেনি বলে দাবি করেন তিনি। তবে যাত্রীদের তোলা ছবি বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রকৃতপক্ষে ফ্লাইটটি সাড়ে পাঁচ ঘণ্টার বেশি সময় বিলম্বিত হয়ে সকাল সাড়ে সাতটায় উড্ডয়ন করে।

বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক গ্রুপ ক্যাপ্টেন এস এম রাগীব সামাদ জানান, ফিটস এয়ারের এই ফ্লাইটটি নির্ধারিত সময়ের ৪৫ মিনিট দেরিতে রাত ২টায় ঢাকায় অবতরণ করে, আর কলম্বোর উদ্দেশে রাত ২টা ১৫ মিনিটে রওনা হওয়ার কথা ছিল। উড্ডয়নের ঠিক আগমুহূর্তে প্রকৌশলীরা বিমানের হাইড্রোলিক ফ্লুইড লেভেল কমে যাওয়ার ত্রুটি শনাক্ত করার পর বিমানটিকে উড্ডয়নের অনুপযোগী ঘোষণা করেন, যার ফলেই এই দীর্ঘ বিলম্ব ঘটে বলে জানান তিনি।

রাগীব সামাদ জানান, যাত্রীরা রাত ২টা ৪৫ মিনিট থেকে সকাল ৭টা ৫০ মিনিট পর্যন্ত—অর্থাৎ প্রায় পাঁচ ঘণ্টা বিমানের ভেতরেই অবস্থান করেন। যাত্রীদের সুবিধার্থে সকাল ৬টার দিকে হালকা নাশতার ব্যবস্থা করা হয়েছিল বলেও জানান তিনি। তবে যাত্রীদের সঙ্গে এয়ারলাইনসের কর্মীদের দুর্ব্যবহার সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ এখনো তাঁদের কাছে আসেনি বলে উল্লেখ করেন নির্বাহী পরিচালক।