যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীনা পণ্যের ওপর উচ্চ শুল্ক আরোপের ফলে সৃষ্ট বৈশ্বিক বাণিজ্য পরিবর্তনের সুফল পেতে শুরু করেছে বাংলাদেশের জুতা শিল্প। রপ্তানিকারকরা মনে করছেন, এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে খাতটিকে বহু বিলিয়ন ডলারের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব।
চামড়া ও নন-লেদার উভয় ধরনের জুতার রপ্তানি বাড়ছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে দীর্ঘদিনের আধিপত্য হারাচ্ছে চীন। শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চলমান জ্বালানি সংকটের সমাধান এবং সরকারের নীতিগত সহায়তা পেলে আগামী দুই বছরের মধ্যে এই খাত থেকে রপ্তানি আয় ৫০০ কোটি ডলারে উন্নীত করা সম্ভব।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাস জুলাই-আগস্টে চামড়া ও নন-লেদার জুতা রপ্তানি থেকে বাংলাদেশ আয় করেছে ২৫ কোটি ৮৪ লাখ ৫০ হাজার ডলার, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ১১ দশমিক ৫ শতাংশ বেশি। বর্তমান বিনিময় হারে (প্রায় ১২৩ টাকা প্রতি ডলার) এই রপ্তানি আয়ের পরিমাণ ৩ হাজার কোটি টাকার বেশি।
ইপিবির তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ৩০ জুন সমাপ্ত অর্থবছরে জুতা রপ্তানি রেকর্ড ১২৩ কোটি ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ২ দশমিক ৩৫ শতাংশ বেশি। কাঁচা চামড়া ও অন্যান্য চামড়াজাত পণ্য যোগ করলে সামগ্রিক চামড়া ও জুতা খাতের রপ্তানি আয় দাঁড়ায় প্রায় ১৭৬ কোটি ডলারে। নতুন অর্থবছরেও এই প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রয়েছে—জুলাই-আগস্টে চামড়ার জুতা রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ১৫ কোটি ১০ লাখ ডলার, যা আগের বছরের তুলনায় ৮ দশমিক ৯১ শতাংশ বেশি। এর তুলনায় দ্রুত বেড়েছে নন-লেদার জুতা রপ্তানি, যা ১৫ দশমিক ২৯ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ১০ কোটি ৭৪ লাখ ডলারে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জুতা রপ্তানির সবচেয়ে বড় একক বাজার। মার্কিন বাণিজ্য বিভাগের অফিস অব টেক্সটাইলস অ্যান্ড অ্যাপারেলের (ওটেক্সা) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম সাত মাসে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ থেকে ২২ কোটি ৬৯ লাখ ডলারের জুতা আমদানি করেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৯ শতাংশ বেশি। এদিকে একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে চীনের জুতা রপ্তানি কমেছে প্রায় ৩৮ শতাংশ। ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, কম্বোডিয়া ও ভারত এই সুযোগের প্রধান সুবিধাভোগী হলেও বাংলাদেশও এই তালিকায় যুক্ত হতে চায়।
লেদারগুডস অ্যান্ড ফুটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (এলএফএমইএবি) সহ-সভাপতি নাসির খান বলেন, বাংলাদেশের জুতা ও চামড়াজাত পণ্যের রপ্তানি আয়ের ৩০ শতাংশের বেশি আসে যুক্তরাষ্ট্র থেকে। তিনি বলেন, ট্রাম্পের শুল্কনীতি চীনের প্রায় একচেটিয়া বাজার নিয়ন্ত্রণে ধাক্কা দিয়েছে, যা বাংলাদেশের জন্য এক সোনালী সুযোগ তৈরি করেছে। তার দাবি অনুযায়ী, মার্কিন পারস্পরিক শুল্ক কাঠামোয় চীনা পণ্যের ওপর শুল্কভার বাংলাদেশের তুলনায় চারগুণেরও বেশি। শ্রমঘন এই খাতে কম শ্রম খরচের কারণে বাংলাদেশের সুবিধা রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, চীনের হারানো বাজারের ২ থেকে ৩ শতাংশও যদি ধরা যায়, তাহলে দুই বছরের মধ্যে ৫০০ কোটি ডলার রপ্তানি আয়ে পৌঁছানো সম্ভব।
এপেক্স ফুটওয়্যারের রপ্তানি ইউনিটের প্রধান পরিচালন কর্মকর্তা মো. নাসরুল্লাহ জানান, শুল্কনীতির এই পরিবর্তন তাদের জন্যও উল্লেখযোগ্য নতুন সুযোগ তৈরি করেছে এবং গত অর্থবছরে তারা দুই অঙ্কের রপ্তানি প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছেন। তবে তিনি জানান, উৎপাদনকারীদের জন্য প্রধান সমস্যা এখনো গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট—দিনে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না, ফলে ডিজেল জেনারেটরের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে এবং উৎপাদন খরচ বেড়ে যাচ্ছে, যা ভিয়েতনাম ও কম্বোডিয়ার মতো প্রতিদ্বন্দ্বীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতা কঠিন করে তুলছে। এছাড়া চামড়া খাতে সাভার চামড়া শিল্প নগরীর কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার নিয়ে বিদেশি ক্রেতাদের অসন্তোষের কারণে অনেক প্রস্তুতকারক এস্টেটের বাইরে থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ বা আমদানি করতে বাধ্য হচ্ছেন, যা উৎপাদন খরচ আরও বাড়াচ্ছে।
নন-লেদার জুতা খাতে দ্রুত প্রবৃদ্ধি দেখা যাচ্ছে। ময়মনসিংহের ভালুকায় ন্যাশনাল পলিমার গ্রুপের (এনপলি) শুনিভার্স ফুটওয়্যার কারখানা মাসে প্রায় ৪ লাখ জোড়া জুতা উৎপাদন করে এবং গড়ে মাসে ৩০ লাখ ডলারের বেশি মূল্যের জুতা রপ্তানি করে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক রিয়াদ মাহমুদ। প্রায় ৪ হাজার শ্রমিক কর্মরত এই কারখানায়। তিনি জানান, আগামী ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তাদের সম্পূর্ণ উৎপাদন সক্ষমতা কাভার করার মতো অর্ডার রয়েছে এবং বড় বড় কোম্পানি চীন থেকে সরে বাংলাদেশমুখী হচ্ছে।
প্রতিষ্ঠিত শিল্প কেন্দ্রের বাইরেও রপ্তানিমুখী কারখানা গড়ে উঠছে। ২০১৭ সালে রংপুরের তারাগঞ্জে ৩ দশমিক ৮৪ হেক্টর জমিতে ব্লিং লেদার প্রতিষ্ঠা করেন মোহাম্মদ হাসানুজ্জামান ও মোহাম্মদ সেলিম নামের দুই ভাই। প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে সম্পূর্ণ রপ্তানিমুখী এবং পোল্যান্ড, তুরস্ক, জার্মানি, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতসহ বিভিন্ন দেশে জুতা রপ্তানি করছে। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাসানুজ্জামান জানান, দৈনিক ৫০ হাজার জোড়া জুতা উৎপাদনে সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে তাদের।
এদিকে আমদানিনির্ভরতা কমাতে গাজীপুরের মৌচাকে ১৪ দশমিক ১৬ হেক্টর জমিতে জেনিস গ্রুপ গড়ে তুলেছে বাংলাদেশ শু সিটি লিমিটেড (বিএসসিএল) নামের একটি শিল্পপার্ক, যেখানে জুতা তৈরির প্রায় ৫০টি গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ ও কাঁচামাল উৎপাদিত হচ্ছে বলে জানিয়েছেন গ্রুপের চেয়ারম্যান নাসির খান।
উল্লেখ্য, বৈশ্বিক জুতা রপ্তানিতে এখনো প্রায় ৬০ শতাংশ বাজার নিয়ন্ত্রণ করছে চীন, এরপর রয়েছে ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, জার্মানি, তুরস্ক ও ভারত। এ তুলনায় বাংলাদেশের অংশ এখনো ছোট। তবে উৎপাদনকারীরা মনে করছেন, পরিবর্তিত বাণিজ্য প্রবাহ, কম শ্রম খরচ, নন-লেদার উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি ও ক্রমবর্ধমান সরবরাহ চেইনের সমন্বয়ে বৈশ্বিক র্যাঙ্কিংয়ে অনেক এগিয়ে যাওয়ার বিরল সুযোগ পেয়েছে বাংলাদেশ। এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ, গ্যাস, কাঁচামাল, দক্ষ জনবল ও নীতিগত সহায়তা যথাসময়ে নিশ্চিত করা।