ছবি : সংগৃহীত

হরমুজ প্রণালি ও বন্দর আব্বাসে ফিরছে স্বাভাবিক জীবন, তবু রয়ে গেছে যুদ্ধের ক্ষত

Share

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালির তীরে অবস্থিত ইরানের বন্দর আব্বাস শহরে যুদ্ধ শুরুর পর প্রথমবারের মতো প্রবেশের সুযোগ পেলেন বিবিসিসহ আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের সাংবাদিকেরা। সেখানে দেখা যায়, জেলেরা ধীরে ধীরে সমুদ্রে ফিরছেন, বাজারে ফিরছে কোলাহল—কিন্তু যুদ্ধের ক্ষতচিহ্ন এখনও স্পষ্ট।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা চালানোর পর জবাবে ইসরায়েল ও উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন সেনা মোতায়েন থাকা দেশগুলোতে পাল্টা হামলা চালায় ইরান। এই অসম যুদ্ধে নিজেদের ভৌগোলিক অবস্থানকে কৌশলগত হাতিয়ার বানায় তেহরান। যুদ্ধ শুরুর পরপরই আইআরজিসি অনুমতি ছাড়া হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের চেষ্টা করা জাহাজে গুলি চালানো শুরু করলে নৌপথটি কার্যত অচল হয়ে পড়ে, যার জেরে বিশ্ববাজারে তেলের দাম বেড়ে যায় এবং যুক্তরাষ্ট্র পাল্টা ব্যবস্থা হিসেবে ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ অবরোধ আরোপ করে।

উত্তেজনা কমলেও সংকট কাটেনি

যুদ্ধবিরতি চুক্তির আওতায় কয়েক সপ্তাহ আগে হরমুজ প্রণালি আংশিক খুলে দেয় ইরান, যার পর জেলেরাও ধীরে ধীরে মাছ ধরায় ফিরছেন। তবে প্রণালিতে এখনও নোঙর করা রয়েছে কয়েক ডজন জাহাজ, যারা অতিক্রমের অনুমতির অপেক্ষায় আছে। এপ্রিলে সংঘাতের চরম পর্যায়ে আইআরজিসির জব্দ করা পানামার পতাকাবাহী এমএসসি ফ্রান্সেসকা ও লাইবেরিয়ার পতাকাবাহী এপামিনোনডাস জাহাজ দুটিও এখনও ছাড়া হয়নি।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রণালি সম্পূর্ণ খুলে না দিলে কঠোর হুঁশিয়ারি দিলেও ইরান এখনও তা পুরোপুরি খোলেনি। বিশ্লেষকদের ধারণা, চলমান শান্তি আলোচনায় এটি এখনও তেহরানের বড় কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে কাজ করছে।

ধ্বংসস্তূপে জীবনের চিহ্ন

বন্দর আব্বাসের একটি বহুতল ভবন গত ২৬ মার্চ ইসরায়েলি হামলায় ধ্বংস হয়ে যায়। ভবনের বাসিন্দাদের পরিচিত ৪০ বছর বয়সী নারী উদ্যোক্তা ফাতিমা জানান, হামলার সময় ঘুমন্ত অবস্থায় তিনজন নিহত হন, যাদের একজন সামরিক কর্মকর্তা ছিলেন। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনীর দাবি, হামলার লক্ষ্য ছিলেন আইআরজিসি নৌবাহিনীর কমান্ডার আলী রেজা তাংসিরি, যার মৃত্যুর বিষয় ইরান চার দিন পর নিশ্চিত করে। রেড ক্রিসেন্টের তথ্যমতে, হরমুজগান প্রদেশে সংঘাতে অন্তত ২৬১ জন নিহত হয়েছেন।

এসিএলইডির তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধবিরতির আগে পর্যন্ত বন্দর আব্বাস ও আশপাশে যুক্তরাষ্ট্র অন্তত ৯৬টি হামলা চালিয়েছে, যার এক-তৃতীয়াংশের বেশি ছিল সামরিক স্থাপনা লক্ষ্য করে।

স্থানীয়দের প্রতিক্রিয়া

বন্দর আব্বাসের মেয়র মেহেদি নোবানি দাবি করেন, যুদ্ধে ইসরায়েল বা যুক্তরাষ্ট্র কেউই তাদের সামরিক লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি এবং সরকার পরিবর্তনের উদ্দেশ্যও সফল হয়নি। তিনি হুঁশিয়ারি দেন, যুদ্ধবিরতি ভেঙে গেলে ইরান হরমুজ প্রণালি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেবে।

স্থানীয় বাজারে ফল বিক্রেতা ৫৫ বছর বয়সী ফাতেমা জানান, যুদ্ধে তার ছেলে চাকরি হারিয়েছেন এবং এখন পরিবার তার দোকানের আয়ের ওপর নির্ভরশীল। তিনি বলেন, তারা কখনও এই যুদ্ধ চাননি। অন্য এক নারী মাসুমেহ বলেন, প্রতিটি যুদ্ধই অর্থনীতি ও জীবনযাত্রায় মারাত্মক প্রভাব ফেলে, তবে এখন ধৈর্য ধরাই তাদের একমাত্র উপায়।

যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের মধ্যে স্থায়ী শান্তিচুক্তির লক্ষ্যে আলোচনা চলছে, যেখানে হরমুজ প্রণালিই থাকবে মূল কেন্দ্রবিন্দু। তবে বন্দর আব্বাসের সাধারণ মানুষের কাছে যুদ্ধের অর্থ কর্মসংস্থান হারানো ও নির্ঘুম রাত—তারা চান এই ভঙ্গুর যুদ্ধবিরতি যেন স্থায়ী হয়।

  • বিবিসির পর্যবেক্ষণ অবলম্বনে