ইয়া আল্লাহ! এই আকাশ-বাতাস, এই জগৎ-সংসারের তুমিই মালিক। কোনো রকম ভূমিকা না টেনেই তোমাকে কিছু কথা বলা জরুরি। দুনিয়ার জন্য তুমি যেসব আইন বহাল রেখেছ, তা বাংলাদেশের দুর্নীতিবাজরা মানছে না। রাষ্ট্র-সমাজ পরিচালনার জন্য নিয়োজিত লোকজনকে তুমি তোমার খলিফা বা প্রতিনিধি রূপে যেভাবে সম্মানিত করার অঙ্গীকার করেছ, তা অস্বীকার করে দুর্বৃত্তরা নিজেদের লোভ-লালসা এবং নফসে আম্মারার দাসত্ব শুরু করেছে।
ফলে ১৮ কোটি বনি আদমের দেশে মজলুমের কান্নায় প্রতি মুহূর্তে আকাশ-বাতাস ভারী হয়ে যাচ্ছে।
হে প্রভু! তুমি যাকে বিত্ত-বৈভব, ধন-সম্পদ দান করেছ, তার সর্বস্ব লুটের জন্য লুটেরারা সিন্ডিকেট করে যেভাবে ডাকাতি শুরু করেছে, তা এই মুহূর্তে তোমার জমিনের অন্য কোথাও ঘটছে কি না, তা আমার জানা নেই। মানুষের পরিশ্রম-মেধা এবং সফলতার ফসল আজ অরক্ষিত। যুগ যুগের মেধা-শ্রম-ত্যাগ-তিতিক্ষার ফসল লুট হয়ে যাচ্ছে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে।
অসহায় মানুষের আহাজারি শোনার জন্য সুবে বাংলায় কোনো জনদরদি নেই—কারো ন্যায়বিচারের চাবুকের ভয় অপরাধীদের মনে ভয়ের সঞ্চার করছে না—উল্টো প্রায় প্রতিদিনই ঘটে চলছে একের পর এক তুঘলকি কাণ্ড।
আকাশের কাছে খোলা চিঠিতোমার বাংলায় যারা সরকারি কর্মচারী, তাদের একাংশের দুর্বৃত্তপনা বলে শেষ করা যাবে না। তারা এখন ঘুষ খায় ওপেন টেন্ডার দিয়ে। ঘুষ-দুর্নীতি নিয়ে এখন আর লুকোচুরি নেই।
ইচ্ছামতো ঘুষের রেট বাড়িয়ে দিয়েছে—টাকা অগ্রিম নিচ্ছে কিন্তু কাজ করছে না। একদল দুর্বৃত্ত ঘুষ নিয়ে কাজ করার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বদলি হয়ে যাচ্ছে, আর অন্য দল এসে নতুন দাবিনামা জারি করে ভুক্তভোগীর জীবন জাহান্নাম বানিয়ে ফেলছে। ফলে ব্যবসা-বাণিজ্য মুখ থুবড়ে পড়েছে, শিল্প-কারখানার চাকা ঠিকমতো ঘুরছে না। মানুষের মনোবল ভেঙে পড়েছে—মাথায় নতুন চিন্তার পরিবর্তে ভয়-আতঙ্ক ভর করেছে। ফলে নতুন ব্যবসা, নতুন বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান প্রায় বন্ধ।
উল্লিখিত অবস্থায় তোমার বান্দাদের মধ্যে সীমাহীন অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। তারা কারণে-অকারণে চিৎকার-চেঁচামেচি করছে। অনেকে ধৈর্যহারা হয়ে অঘটন ঘটাচ্ছে। দরিদ্রতা, বেকারত্ব এবং নিরাপত্তাহীনতা বিশাল জনগোষ্ঠীর জন্য অনিবার্য হয়ে গেছে। একদল খুব বেশি চুপচাপ—নির্জীব ও নিষ্ক্রীয় হয়ে পড়েছে। অন্য দল সীমা অতিক্রম করছে এবং শক্তি-সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে শুধু অজগরের মতো গিলছে। একদল হায়েনার মতো ঝাঁপিয়ে পড়ছে, আর অন্য দল পছন্দের মতো আকাশে উড়ছে এবং শিকারের প্রাণবায়ু বের হওয়ার অপেক্ষা করছে।
মানুষের ব্যক্তিগত-সামাজিক-রাজনৈতিক অধিকার এখন চরম ঝুঁকির মধ্যে। সম্পত্তির মালিক হওয়া, নিজের উপার্জন দ্বারা স্বাধীনভাবে ভোগ করা, নিরাপদে ঘুমাতে যাওয়া, সুন্দর সুন্দর স্বপ্ন দেখা, সুন্দর একটি সকালে নতুন উদ্দীপনা নিয়ে রিজিকের সন্ধানে বের হওয়ার যে মানবিক বৈশিষ্ট্য, তা ক্রমেই অসম্ভব হয়ে পড়েছে। তোমার দেওয়া কথা বলার স্বাধীনতা, চিন্তার স্বাধীনতা এবং লেখার স্বাধীনতার ওপর অজানা জগদ্দল পাথর এমনভাবে চেপে বসেছে, যা সরানো যাচ্ছে না। ফলে অনেকের নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। অনেকে চিৎকার করে কাঁদতে চাচ্ছে, কিন্তু অজানা আতঙ্ক কান্নার শব্দের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে ফেলেছে।
জীবন কতটা দুর্বিষহ হয়ে পড়েছে, তা রূপক অর্থে আবদুল করিম মিয়ার কাহিনি দিয়ে তোমাকে বোঝানোর চেষ্টা করছি। তোমার এই বাংলায় করিম মিয়ার সততা বহুবার প্রমাণিত হয়েছে। করিম মিয়া তোমাকে বিশ্বাস করে, তোমার হুকুম মান্য করে এবং শত দুর্ভোগের পরও তোমার মত ও পথ ছেড়ে দুর্বৃত্তদের অনুসরণ করে না। তো সেই আবদুল করিম মিয়া একবার একটি ব্যবসা শুরু করল। কয়েক বছর পর সরকারের একটি বিভাগ থেকে বলা হলো—আপনার প্রতিষ্ঠান অডিট রিপোর্ট জমা দেয়নি। করিম মিয়া বিধি মোতাবেক অডিট রিপোর্ট জমা দিল। দুর্বৃত্তরা অডিটে কোনো ত্রুটি না পেয়ে সময়ক্ষেপণ করতে লাগল।
করিম মিয়ার লোকজন দু-তিন বছর জুতার তলা ক্ষয় করে সরকারি অফিসে রোজ ধরনা দিল, কিন্তু কোনো ঘুষ দিল না। দুর্বৃত্তরা বিরক্ত হয়ে ফাইল লুকিয়ে ফেলল। করিম মিয়া শত চেষ্টা করেও ফাইলের সন্ধান পেল না। সাত-আট বছর পর সংশ্লিষ্ট অফিস থেকে বলা হলো, যেহেতু নির্দিষ্ট দিনে আপনি শুনানিতে অংশ নেননি, তাই আপনার বিরুদ্ধে একতরফা রায় ঘোষিত হলো। করিম মিয়া বিধি মোতাবেক আপিল করতে গেল। আপিল ট্রাইব্যুনাল বললেন, মামলাটি তামাদি হয়ে গেছে। হাইকোর্টে গিয়ে তামাদি মওকুফ করে আনতে হবে। করিম মিয়া দেড় বছর ধরে হাইকোর্টের বারান্দায় ঘুরছে, কিন্তু মামলাটি শুনানির জন্য একটি তারিখ পাচ্ছে না। মহামান্য হাইকোর্টের মামলার যে জট, সেখানে সিরিয়াল অনুযায়ী শুনানি হতে কত বছর লাগবে, তা কেবল তুমিই জানো।
করিম মিয়ার মতো হাজার হাজার বান্দা-বান্দি পোর্ট-কাস্টমস, ভ্যাট, আয়কর বিভাগ, থানা পুলিশ-কোর্ট-কাচারি, ভূমি অফিস, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন, ইউনিয়ন পরিষদ, ওয়াসা, পরিবেশ অধিদপ্তর, রাজউক, ভোক্তা অধিকার, কলকারখানা অধিদপ্তর ইত্যাদি বিভাগ ও অনুবিভাগ দ্বারা যেভাবে হয়রানির শিকার হয়ে আসছিল, তা গত ১৫ মাসে রীতিমতো গজবে পরিণত হয়েছে। আদিকালে কোনো সমস্যা হলে তা সমাধানের ১০০টি রাস্তা ছিল। আর বর্তমান সময়ে কোনো সমস্যা হলে তা আরো জটিল ও কুটিল করে তোলার জন্য হাজারটি ইবলিশ এসে যমদূতের মতো হাজির হয়। ফলে দেশের অর্থনীতি যেভাবে দুর্ভিক্ষের কবলে পড়তে যাচ্ছে, তাতে ১৮ কোটি আদম সন্তানের জন্য তোমাকে হয়তো আসমান থেকে মান্না ও সালোয়া পাঠিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া লাগতে পারে।
তোমার বাংলায় রক্ষকরা ভক্ষকে পরিণত হয়ে গেছে। মানুষের লোভ-লালসার জিহ্বা রূপকথার সিনেমা ‘দ্য মাস্ক’-এর জিম ক্যারির জিহ্বার চেয়েও লম্বা হয়ে গেছে। অনেক মানুষের চেহারার মানবিক আকৃতি দানবে পরিণত হয়েছে। তারা এখন জল্লাদ-কসাই রূপে লম্ফঝম্প শুরু করেছে। মন্দ কর্ম করার জন্য রাক্ষসীয় প্রতিযোগিতা চলছে এবং মজলুমদের পেছনে কোবরা ডান্স বা কালনাগিনীর নৃত্য করে পৈশাচিক উল্লাস করছে। চারদিকে অশ্লীল শক্তি। অশ্লীল মানুষ, অশ্লীল দৃশ্য এবং নোংরা পূতিগন্ধময় আবহাওয়া তৈরির জন্য পিশাচদের তাণ্ডব চলছে।
মানুষের মধ্যে মোনাফেকির অভ্যাস জ্যামিতিক হারে বেড়ে যাচ্ছে। কাজ্জাব বা মিথ্যাবাদী তৈরি বা প্রজননের প্রতিযোগিতা চলছে। নিষ্ঠুরতা-নির্মমতা-অমানবিকতার মতো সভ্যতা বিধ্বংসী দোষগুলোকে মানবচরিত্রে ঢুকিয়ে সমাজকে জঙ্গল বানানোর তোড়জোড় শুরু হয়েছে। বুড়োরা গুঁড়োর মতো লাফাচ্ছে আর গুঁড়োরা বুড়োদের মতো পাণ্ডিত্য দেখাচ্ছে। বিদ্যাবুদ্ধি এখন মানুষের জন্য আপদ-বিপদের কারণ হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে অজ্ঞতা-মূর্খতা ইত্যাদি বহু মানুষের কাছে লোভনীয় পদ-পদবিতে পরিণত হয়েছে। হালালের পরিবর্তে হারাম—আরামের পরিবর্তে বিরাম এবং সুখের পরিবর্তে অসুখ তৈরির ওষুধপত্র-যন্ত্রপাতি পথে-প্রান্তরে মুড়ি-মুড়কির মতো সহজলভ্য হয়ে গেছে।
পরিস্থিতির চাপে মানুষ বুঝতে পারছে না—কোনটা লাউ আর কোনটা কদু। মানুষ দিন-রাত, ভালো-মন্দ, শীত-গ্রীষ্মের পার্থক্য ভুলে গেছে। কোনটা গালি আর কোনটা সংগীত তার পার্থক্য করার মতো রুচি-শিক্ষা নির্বাসনে চলে যাচ্ছে। হাসিকান্না একাকার হয়ে গেছে। মানুষের পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের ভারসাম্য নষ্ট হয়ে গেছে—কামক্রোধ মারামারি শুরু করেছে। লোভ-লালসার দোস্তি হয়ে গেছে। চিন্তা-চেতনা মরে গেছে এবং অনুভূতির কোষগুলো কে বা কারা যেন নষ্ট করে দিয়েছে। ফলে পুরো জাতির বিরাটসংখ্যক মানুষ ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ছে। তারা দিনের আলোতে অমাবস্যার ভয়াল নিকষকালো অন্ধকার অনুভব করছে, আর মধ্যরাতে নিশীথ সূর্যের দেশের মতো সূর্যের আলো খুঁজে বেড়াচ্ছে।
ওহে পরোয়ারদিগার, তোমার কাছে প্রার্থনা, তুমি আমাদের রক্ষা করো। হেদায়েত দান করো এবং তোমার বান্দা-বান্দিদের নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য উপযুক্ত নেতা দান করো। আমাদের সত্যিকার অর্থে আশরাফুল মাকলুকাত বানিয়ে দাও এবং দাজ্জালি ফিতনা-ফ্যাসাদ থেকে রক্ষা করো। আমরা তোমার ক্রোধ থেকে তোমার কাছে পানাহ চাই। তুমি জালিমদের শায়েস্তা করো এবং মজলুমদের তোমার রহমতের চাদরে আচ্ছাদিত করো। তুমি আমাদের মধ্যে যারা যোগ্য, তাদের সাহস-শক্তি এবং মদদ দান করো, যেন একটি সভ্য দেশ-জাতি-রাষ্ট্র গঠনে আমরা তোমার হুকুম-আহকাম মেনে সঠিক কাজটি সঠিক সময়ে করতে পারি। আমিন! ছুম্মা আমিন।
লেখক : গোলাম মাওলা রনি
দৈনিক কালের কণ্ঠ
বৃহস্পতিবার, ১১ ই ডিসেম্বর 2025