ছবি: সংগৃহীত

যিলহজ্ব ও আশারায়ে যিলহজ্ব ‖ ফযীলত ও আমল

Share

যিলহজ্ব– আরবী বারো মাসের সর্র্বশেষ মাস। একটি বছরের সমাপ্তি এবং আরেকটি বছরের সূচনা– এ বার্তা বহন করে মাহে যিলহজ্ব। একজন মুমিনকে নতুন করে ভাবতে শেখায় জীবন সম্পর্কে। সতর্ক করে পেছনের হিসাব মেলাতে। সজাগ করে ভবিষ্যতের ব্যাপারে।

শরীয়ত এ মাসকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করেছে। ইসলামের বহু ঐতিহাসিক ঘটনা ও প্রেক্ষাপট এবং দ্বীনের বিভিন্ন নীতিমালা ও বিধিবিধানের সংশ্লিষ্টতা জড়িয়ে রয়েছে এ মাসকে কেন্দ্র করে। হজ্ব ও কুরবানীর মতো ইসলামের পরিচয়-চিহ্ন বহনকারী মহিমান্বিত দুটি ইবাদত সংঘটিত হয় এ মাসেই। পবিত্র হজ্বের মূল কার্যক্রম যেহেতু এ মাসেই হয়ে থাকেসে বিবেচনায় এ মাসকে যিলহজ্ব বলে অভিহিত করা হয়।

অতএব অত্যন্ত গুরুত্বমর্যাদা ও তাৎপর্য মণ্ডিত মাসের নাম যিলহজ্ব মাস।

পবিত্র কুরআন মাজীদে বছরের বারো মাসের মাঝে চারটি মাসকে মর্যাদাপূর্ণ মাস হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

আল্লাহ তাআলা বলেন

اِنَّ عِدَّةَ الشُّهُوْرِ عِنْدَ اللهِ اثْنَا عَشَرَ شَهْرًا فِيْ كِتٰبِ اللهِ يَوْمَ خَلَقَ السَّمٰوٰتِ وَالْاَرْضَ مِنْهَاۤ اَرْبَعَةٌ حُرُمٌ.

আল্লাহ যেদিন আসমান-জমিন সৃষ্টি করেছেনসেদিন থেকেই মাসসমূহের গণনা আল্লাহ তাআলার নিকট তাঁর বিধান মতে বারোটি। তন্মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত। সূরা তাওবা (৯) : ৩৬

আর সেই চার মাসের বিবরণ এসেছে হাদীস শরীফে

إِنّ الزّمَانَ قَدِ اسْتَدَارَ كَهَيْئَتِه يَوْمَ خَلَقَ اللهُ السّمَوَاتِ وَالأَرْضَ، السّنَةُ اثْنَا عَشَرَ شَهْرًا، مِنْهَا أَرْبَعَةٌ حُرُمٌ، ثَلاَثٌ مُتَوَالِيَاتٌ: ذُو القَعْدَةِ، وَذُو الحِجّةِ، وَالمُحَرّمُ، وَرَجَبُ مُضَرَ،الّذِي بَيْنَ جُمَادَى وَشَعْبَانَ.

নিশ্চয় সময়ের হিসাব যথাস্থানে ফিরে এসেছেআসমান-জমিন সৃষ্টির সময় যেমন ছিল (কারণ আরবরা মাস-বছরের হিসাব কম-বেশি ও আগপিছ করে ফেলেছিল)বারো মাসে এক বছর। এর মধ্য থেকে চারটি মাস সম্মানিত। তিনটি মাস ধারাবাহিক– যিলকদযিলহজ্বমুহাররম। আরেকটি হল রজবযা জুমাদাল আখিরাহ ও শাবানের মাঝে আসে। সহীহ বুখারীহাদীস ৪৬৬২

বিদায় হজ্বের ভাষণে নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যিলহজ্ব মাসকে শ্রেষ্ঠ মাস হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

তিনি বলেছেন

أَلَا وَإِنّ أَحْرَمَ الشُّهُورِ شَهْرُكُمْ هذَا.

জেনে রাখো! সবচেয়ে সম্মানিত মাস হলতোমাদের এ মাস (যিলহজ্ব)। সুনানে ইবনে মাজাহহাদীস ৩৯৩১মুসনাদে আহমাদহাদীস ১১৭৬২

এছাড়া এ মাসের প্রথম দশকের রয়েছে বিশেষ ফযীলত। কুরআন মাজীদে আল্লাহ তাআলা দশ রজনির শপথ করেছেন

وَالْفَجْرِ،  وَ لَيَالٍ عَشْرٍ.

শপথ ফযরেরশপথ দশ রাত্রির। সূরা ফাজ্‌র (৮৯) : ১-২

কোন্ সেই দশ রজনিআবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রা. ও মুজাহিদ রাহ.-সহ অনেক সাহাবীতাবেয়ী ও মুফাসসির বলেনএখানে ‘দশ রাত্রি’ দ্বারা যিলহজ্বের প্রথম দশ রাতকেই বোঝানো হয়েছে। (দ্র. তাফসীরে ইবনে কাসীর ৪/৫৩৫)

নবীজী যিলহজ্বের প্রথম দশকের নেক আমলকে অন্যান্য দিনের তুলনায় আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয় বলেছেন।  (দ্রষ্টব্য : সুনানে আবু দাউদহাদীস ২৪৩৮সহীহ বুখারীহাদীস ৯৬৯)

বিশেষ করে যিলহজ্বের নবম তারিখের কথা হাদীস শরীফে বহু গুরুত্বের সাথে উল্লেখ করা হয়েছে। এই দিনে হাজ্বী ছাহেবান আরাফার ময়দানে উকূফ (অবস্থান) করেন। পবিত্র হজ্ব পালনের একটি ফরয বিধান হচ্ছে ‘উকূফে আরাফা’ তথা আরাফায় অবস্থান করা এবং হজ্বের মূল দিন হচ্ছে যিলহজ্বের ৯ তারিখ তথা ‘ইয়াওমে আরাফা’।

এ দিনে বান্দার প্রতি রবের রহমতের জোয়ার প্রবল বেগে ধাবিত হয়। অসংখ্য বান্দাকে তিনি এ দিনে ক্ষমা করে দেন এবং জাহান্নাম থেকে মুক্ত করেন।

উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রা. থেকে বর্ণিতরাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন

مَا مِنْ يَوْمٍ أَكْثَرَ مِنْ أَنْ يُعْتِقَ اللهُ فِيهِ عَبْدًا مِنَ النّارِ، مِنْ يَوْمِ عَرَفَةَ، وَإِنّه لَيَدْنُو، ثُمّ يُبَاهِي بِهِمِ الْمَلَائِكَةَ، فَيَقُولُ: مَا أَرَادَ هَؤُلَاءِ؟

আরাফার দিনের মতো আর কোনো দিন এত অধিক পরিমাণে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়া হয় না। আল্লাহ তাআলা দুনিয়ার নিকটবর্তী হন এবং বান্দাদের নিয়ে ফেরেশতাদের নিকট গর্ব করেন। আল্লাহ বলেনকী চায় তারা? –সহীহ মুসলিমহাদীস ১৩৪৮

অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা তাঁর বান্দাদের ক্ষমা করার জন্য এবং জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য ফেরেশতাদেরকে এভাবে বলতে থাকেন।

জাবের রা. থেকে বর্ণিত আরেক বর্ণনায় এসেছে

يَنْزِلُ اللهُ إِلَى السّمَاءِ الدّنْيَا فَيُبَاهِي بِأَهْلِ الْأَرْضِ أَهْلَ السّمَاءِ، فَيَقُولُ: انْظُرُوا إِلَى عبادي شعثا غبرا ضاحين، جاؤوا مِنْ كُلِّ فَجٍّ عَمِيقٍ يَرْجُونَ رَحْمَتِي، وَلَمْ يَرَوْا عَذَابِي، فَلَمْ يُرَ يَوْمٌ أَكْثَرُ عِتْقًا من النار من يوم عرفة.

আল্লাহ তাআলা নিকটতম আসমানে আসেন এবং পৃথিবীবাসীকে নিয়ে আসমানের অধিবাসী অর্থাৎ ফেরেশতাদের সাথে গর্ব করেন। বলেনদেখ তোমরা! আমার বান্দারা উশকোখুশকো চুলেধুলোয় মলিন বদনেরোদে পুড়ে দূরদূরান্ত থেকে এখানে সমবেত হয়েছে। তারা আমার রহমতের প্রত্যাশী। অথচ তারা আমার আযাব দেখেনি। ফলে আরাফার দিনের মতো আর কোনো দিন এত অধিক পরিমাণে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়া হয় না। সহীহ ইবনে হিব্বানহাদীস ৩৮৫৩

এ দিনে আল্লাহ তাআলা নাযিল করেছেন কুরআন কারীমের আয়াত

اَلْيَوْمَ اَکْمَلْتُ لَکُمْ دِيْنَکُمْ وَاَتْمَمْتُ عَلَيْکُمْ نِعْمَتِيْ وَرَضِيْتُ لَکُمُ الْاِسْلَامَ دِيْنًا.

আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করলাম এবং তোমাদের প্রতি আমার নিআমত পরিপূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দ্বীন মনোনীত করলাম। সূরা মায়েদা (৫) : ৩

সার্বিক বিবেচনায় এ মাসের গুরুত্ব ও মহিমা অপরিসীম।

এতক্ষণ যিলহজ্ব মাসের ফযীলত ও মর্যাদা সম্পর্কে কিঞ্চিৎ আলোকপাত হল। এপর্যায়ে সংক্ষেপে এ মাসের কিছু করণীয় তুলে ধরা হচ্ছে

যিলহজ্ব মাস : নেক আমলে যত্নবান হই

যিলহজ্ব মাস আল্লাহমুখী হওয়ার মাস। এজন্য বান্দার কর্তব্য হচ্ছেঅন্য সময়ের তুলনায় এ সময়গুলোতে নেক আমলের প্রতি আরও বেশি যত্নবান হওয়া। বিশেষ করে যিলহজ্বের প্রথম দশকে আমলের পরিমাণ বাড়িয়ে দেওয়া উচিত।

নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন

مَا مِنْ أَيّامٍ الْعَمَلُ الصّالِحُ فِيهَا أَحَبّ إِلَى اللهِ مِنْ هذِهِ الْأَيّامِ يَعْنِي أَيّامَ الْعَشْرِ، قَالُوا: يَا رَسُولَ اللهِ، وَلَا الْجِهَادُ فِي سَبِيلِ اللهِ؟ قَالَ: وَلَا الْجِهَادُ فِي سَبِيلِ اللهِ، إِلّا رَجُلٌ خَرَجَ بِنَفْسِهِ وَمَالِه، فَلَمْ يَرْجِعْ مِنْ ذلِكَ بِشَيْءٍ.

আল্লাহর নিকট যিলহজ্বের দশ দিনের নেক আমলের চেয়ে অধিক প্রিয় অন্য কোনো দিনের আমল নেই।

সাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেনইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহর রাস্তায় জিহাদও কি (এর চেয়ে উত্তম) নয়?

তিনি বললেননাআল্লাহর রাস্তায় জিহাদও নয়। তবে হাঁসেই ব্যক্তির জিহাদ এর চেয়ে উত্তমযে নিজের জানমাল নিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের জন্য বের হয়েছে। অতঃপর কোনো কিছু নিয়ে ঘরে ফিরে আসেনি (অর্থাৎ শাহাদাত বরণ করেছে)। সুনানে আবু দাউদহাদীস ২৪৩৮সহীহ বুখারীহাদীস ৯৬৯জামে তিরমিযীহাদীস ৭৫৭সুনানে ইবনে মাজাহহাদীস ১৭২৭মুসনাদে আহমাদহাদীস ১৯৬৮

কী কী আমল করবযে-কোনো নফল আমলের পরিমাণ এ সময় বাড়িয়ে দিতে পারি। বিশেষ করে এ দিনগুলোতে রোযা রাখা অত্যন্ত সওয়াবের কাজ। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যিলহজ্বের প্রথম নয় দিন রোযা রাখার ব্যাপারে যত্নবান ছিলেন।

ইরশাদ হয়েছে

كَانَ رَسُولُ اللهِ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ يَصُومُ تِسْعَ ذِي الْحِجّةِ.

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম যিলহজ্বের নয়টি দিবসে (সাধারণত) রোযা রাখতেন। সুনানে আবু দাউদহাদীস ২৪৩৭মুসনাদে আহমাদহাদীস ২২৩৩৪সুনানে কুবরাবায়হাকীহাদীস ৮৩৯৩

উম্মুল মুমিনীন হাফসা রা. থেকে বর্ণিত আরেক বর্ণনায় এসেছেতিনি বলেন

أَرْبَعٌ لَمْ يَكُنْ يَدَعُهُنّ النّبِيّ صَلّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ: صِيَامَ عَاشُورَاءَ، وَالْعَشْرَ، وَثَلَاثَةَ أَيّامٍ مِنْ كُلِّ شَهْرٍ، وَرَكْعَتَيْنِ قَبْلَ الْغَدَاةِ.

চারটি আমল নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো ছাড়তেন না। আশুরার রোযাযিলহজ্বের প্রথম দশকের (নয় দিনের) রোযাপ্রত্যেক মাসের তিন দিনের রোযাফজরের আগে দুই রাকাত সুন্নত নামায। সুনানে নাসায়ীহাদীস ২৪১৫সহীহ ইবনে হিব্বানহাদীস ৬৪২২মুসনাদে আহমাদ, হাদীস ২৬৩৩৯

বেশি বেশি যিকির করি

এ দিনগুলোতে বেশি বেশি যিকির করতে পারি।

হাদীস শরীফে এসেছে

مَا مِنْ أَيّامٍ أَعْظَمُ عِنْدَ اللهِ وَلَا أَحَبّ إِلَيْهِ الْعَمَلُ فِيهِنّ مِنْ هَذِهِ الْأَيّامِ الْعَشْرِ، فَأَكْثِرُوا فِيهِنّ مِنَ التّهْلِيلِ وَالتّكْبِيرِ وَالتّحْمِيدِ.

আল্লাহ তাআলার নিকট আশারায়ে যিলহজ্বের আমলের চেয়ে অধিক মহৎ এবং অধিক প্রিয় অন্য কোনো দিনের আমল নেই। সুতরাং তোমরা এই দিনগুলোতে বেশি বেশি ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ’, ‘আল্লাহু আকবার’ এবং ‘আলহামদু লিল্লাহ’ পাঠ কর। মুসনাদে আহমাদহাদীস ৫৪৪৬আদদাআওয়াতুল কাবীরতবারানী, হাদীস ৫৩৪

নয় যিলহজ্বের রোযা

যিলহজ্ব মাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দিন হচ্ছে এর নবম তারিখ। হাদীসের ভাষায় ‘ইয়াওমু আরাফা’। এ দিনে আল্লাহ তাআলা সাধারণ ক্ষমার ঘোষণা দেন। ফলে এ দিনটি দুআ-দুরূদতওবা-ইস্তেগফারে কাটানো দরকার। বিশেষ করে এ দিনে রোযা রাখার ব্যাপারে হাদীসে বিশেষ ফযীলতের কথা এসেছে।

নবীজী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন

صِيَامُ يَوْمِ عَرَفَةَ، أَحْتَسِبُ عَلَى اللهِ أَنْ يُكَفِّرَ السّنَةَ الّتِي قَبْلَهُ، وَالسّنَةَ الّتِي بَعْدَهُ.

আরাফার দিনের (নয় যিলহজ্বের) রোযার বিষয়ে আমি আল্লাহর কাছে প্রত্যাশা রাখি যেতিনি পূর্বের এক বছরের এবং পরের এক বছরের গোনাহসমূহ ক্ষমা করে দেবেন। সহীহ মুসলিমহাদীস ১১৬২

ইয়াওমে আরাফার বিশেষ দুআ

এদিন হাদীসে বর্ণিত দুআ ও যিকিরগুলো বেশি বেশি পাঠ করতে পারি। এ দিনের বিশেষ একটি দুআর ব্যাপারে নবীজী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন

خَيْرُ الدّعَاءِ دُعَاءُ يَوْمِ عَرَفَةَ، وَخَيْرُ مَا قُلْتُ أَنَا وَالنّبِيّونَ مِنْ قَبْلِي: لَا إِلهَ إِلّا اللهُ وَحْدَه لَا شَرِيْكَ لَه، لَهُ المُلْكُ وَلَهُ الحَمْدُ،وَهُوَ عَلى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيْرٌ.

শ্রেষ্ঠ দুআ হচ্ছে আরাফার দুআ। দুআ-যিকির হিসেবে সর্বোত্তম হল ঐ দুআযা আমি এবং আমার পূর্ববর্তী নবীগণ করেছেন। তা হল

لَا إِلهَ إِلّا اللهُ وَحْدَه لَا شَرِيْكَ لَه، لَهُ المُلْكُ وَلَهُ الحَمْدُ وَهُوَ عَلى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيْرٌ.

জামে তিরমিযীহাদীস ৩৫৮৫শুআবুল ঈমানবায়হাকীহাদীস ৩৭৭৮

অতএব আমরা এ দুআটিও বিশেষ ইহতিমামের সাথে আদায় করতে পারি।

তাকবীরে তাশরীক : যিলহজ্ব মাসের গুরুত্বপূর্ণ একটি আমল

যিলহজ্ব মাসের গুরুত্বপূর্ণ একটি আমল হচ্ছেআইয়ামে তাশরীকে তাকবীরে তাশরীক পড়া। এ দিনগুলোতে তাকবীর পড়া ওয়াজিব। অর্থাৎ নয় যিলহজ্ব ফজর থেকে নিয়ে তেরো যিলহজ্ব আসর পর্যন্ত মোট ২৩ ওয়াক্ত। এ সময়ের প্রত্যেক ফরয নামাযের পর নারী-পুরুষ সকলের জন্য একবার তাকবীরে তাশরীক বলা ওয়াজিব।

তাকবীরে তাশরীক হল

اللهُ أَكْبَرُ،اللهُ أَكْبَرُ،لَا إِلهَ إِلّا اللهُ، وَاللهُ أَكْبَرُ اللهُ أَكْبَرُ،وَلِلهِ الْحَمْدُ.

সর্বমোট পাঁচ দিন তাকবীরে তাশরীক বলা হলেও পরিভাষায় এগারোবারো ও তেরো যিলহজ্বকে আইয়ামে তাশরীক বলা হয়। (দ্র. মাউসুআ ফিকহিয়্যা কুয়েতিয়্যা ৭/৩২৫)

কুরআন কারীমে আল্লাহ তাআলা বলেন

وَاذْكُرُوا اللهَ فِيْۤ اَيَّامٍ مَّعْدُوْدٰتٍ.

তোমরা নির্দিষ্ট দিনগুলোতে আল্লাহকে স্মরণ কর। সূরা বাকারা (২) : ২০৩

ইবনে আব্বাস রা. বলেনএখানে اَيَّامٍ مَّعْدُوْدٰتٍ দ্বারা উদ্দেশ্য– আইয়ামে তাশরীক। (দ্র. সহীহ বুখারীবাবু ফাদলিল আমাল ফী আইয়ামিত তাশরীক)

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন

أَيّامُ التّشْرِيقِ أَيّامُ أَكْلٍ، وَشُرْبٍ، وَذِكْرِ اللهِ.

আইয়ামে তাশরীক পানাহার ও আল্লাহর যিকিরের দিন। মুসনাদে আহমাদহাদীস ২০৭২২সহীহ মুসলিমহাদীস ১১৪১

তো দেখা যাচ্ছেএ দিনগুলো বেশি বেশি তাকবীর ধ্বনি উচ্চকিত করার দিন। সাহাবায়ে কেরাম এই দিনগুলোতে তাকবীর ধ্বনি তুলতেন। আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. ও আবু হুরায়রা রা. বাজারে গিয়ে তাকবীরের আওয়াজ তুলতেন। শুনে শুনে অন্যরাও তাদের সাথে তাকবীরের ধ্বনি তুলত। সহীহ বুখারীবাবু ফাদলিল আমাল ফী আইয়ামিত তাশরীকফাতহুল বারী ২/৪৫৭

অতএব আমরা এ দিনগুলোতে যিকির ও তাকবীর পাঠের খুব ইহতিমাম করব। অন্তত আমাদের ঘরগুলোতে যেন যিকরুল্লাহ্র এক আবহ বিরাজ করে।

এ মাস অন্যায় থেকে বিরত থাকার মাস

সূরা তাওবার যে আয়াতে সম্মানিত চার মাসের কথা উল্লেখ হয়েছেসেখানে আল্লাহ তাআলা বলেন

مِنْہَاۤ اَرْبَعَةٌ حُرُمٌ  ذٰلِکَ الدِّيْنُ الْقَيِّمُ فَلَا تَظْلِمُوْا فِيْهِنَّ اَنْفُسَكُمْ.

…তন্মধ্যে চারটি মাস সম্মানিত। এটাই সহজ-সরল দ্বীন (-এর দাবি)। সুতরাং এ মাসসমূহে তোমরা নিজেদের প্রতি জুলুম করো না। সূরা তাওবা (৯) : ৩৬

কাজেই এ মাসগুলোতে সর্বপ্রকার অন্যায় ও গর্হিত কর্মকাণ্ড পরিত্যাগ করা উচিত। এ সময় আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে চলে যেভাবে বহুদূর অগ্রসর হওয়া সম্ভবতেমনি আল্লাহর নাফরমানীও ডেকে আনতে পারে মহা বিপর্যয়। কাজেই কমপক্ষে মন্দ থেকে বেঁচে থাকার অনুশীলনটা রপ্ত করতে পারাটাও অনেক বড় অর্জন। নিজেও কোনো নাফরমানী করব না এবং কারও ওপর কোনো জুলুম অবিচার করব না। কাউকে কোনো কষ্ট না দেওয়াটাও ইসলামের দৃষ্টিতে সদকার সওয়াব।

এক্ষেত্রে আমরা মনে রাখতে পারি প্রিয় নবীজীর অমিয় বানী

كُفَّ شَرَّكَ عَنِ النَّاسِ، فَإِنَّهَا صَدَقَةٌ مِنْكَ عَلَى نَفْسِكَ.

তুমি মানুষকে কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকো। এটাই তোমার জন্য সদকার সওয়াব। সহীহ বুখারীহাদীস ২৫১৮সহীহ মুসলিমহাদীস ২৪

যিলহজ্ব শুরু হলে নখ-চুল না কাটি পূর্বেই প্রস্তুতি গ্রহণ করি

এ দশকের একটি বিশেষ আমল হচ্ছেযিলহজ্বের চাঁদ ওঠা থেকে নিয়ে কুরবানী করা পর্যন্ত নখ-চুল না কাটানা ছাটা। এতে একদিকে হাজ্বী ছাহেবানের সাথে একরকম সাদৃশ্য প্রকাশ পায়। পাশাপাশি এর রয়েছে বিশেষ ফযীলতও।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়সাল্লাম ইরশাদ করেন

إِذَا رَأَيْتُمْ هِلَالَ ذِي الْحِجّةِ، وَأَرَادَ أَحَدُكُمْ أَنْ يُضَحِّيَ، فَلْيُمْسِكْ عَنْ شَعْرِهِ وَأَظْفَارهِ.

যখন যিলহজ্বের চাঁদ দেখবেতোমাদের মধ্যে যে কুরবানী করবে সে যেন তার চুল নখ না কাটে। সহীহ মুসলিমহাদীস ১৯৭৭জামে তিরমিযীহাদীস ১৫২৩

অতএব যিলহজ্ব আগমনের পূর্বেই নখ-চুল কেটে ছেটে পরিপাটি হয়ে থাকা বাঞ্ছনীয়। যারা কুরবানী করবেনতারা তো এ মুস্তাহাবের প্রতি যত্নবান হবেনইঅন্যান্য বর্ণনার নিরিখে এ-ও বুঝে আসে যেযারা কুরবানী করবেন নাতারাও ফযীলতপূর্ণ এ আমলে শরীক হতে পারেন। এমনকি শিশুদেরকেও অভিভাবকগণ চুল-নখ কাটা থেকে বিরত রাখতে পারেন। এতেও ইনশাআল্লাহ সাওয়াব হাসিল হবে। (দ্র. সুনানে আবু দাউদহাদীস ২৭৮৯সুনানে নাসায়ীহাদীস ৪৩৬৫মুস্তাদরাকে হাকেমহাদীস ৭৫২০আলমুহাল্লাইবনে হাযম ৬/২৮)

সামর্থ্যবানদের কর্তব্য হজ্ব ও কুরবানী আদায়ে যত্নবান হওয়া

যিলহজ্ব মাস হচ্ছে হজ্ব ও কুরবানী আদায়ের মাস। আল্লাহ রাব্বুল আলামীন যাদেরকে তাওফীক দিয়েছেনশরীয়তের গুরুত্বপূর্ণ বিধান– ইবাদতদুটি পালনের প্রতি পূর্ণ আন্তরিকতার সাথে মনোযোগী হই এবং ইখলাসের সাথে তা আদায় করতে সচেষ্ট থাকি।

হজ্বের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন

وَ لِلهِ عَلَي النَّاسِ حِجُّ الْبَيْتِ مَنِ اسْتَطَاعَ اِلَيْهِ سَبِيْلًا وَ مَنْ كَفَرَ فَاِنَّ اللهَ غَنِيٌّ عَنِ الْعٰلَمِيْنَ.

মানুষের মধ্যে যার সেখানে যাওয়ার সামর্থ্য আছেআল্লাহর উদ্দেশ্যে ঐ গৃহের হজ্ব করা তার জন্য অবশ্যকর্তব্য। আর যে (এই নির্দেশ পালন করতে) অস্বীকার করবে তার জেনে রাখা উচিত যেআল্লাহ দুনিয়াবাসীদের প্রতি সামান্যও মুখাপেক্ষী নন। সূরা আলে ইমরান (৩) : ৯৭

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন

مَنْ حَجّ لِلهِ فَلَمْ يَرْفُثْ وَلَمْ يَفْسُقْ رَجَعَ كَيَوْمِ وَلَدَتْهُ أُمّهُ.

যে ব্যক্তি একমাত্র অল্লাহ্র সন্তুষ্টির জন্য হজ্ব করে এবং কোনো অশ্লীল কাজ বা গুনাহে লিপ্ত হয় নাসে যেন সদ্যভূমিষ্ঠ শিশুর ন্যায় নিষ্পাপ হয়ে বাড়ি ফেরে। সহীহ বুখারীহাদীস ১৫২১

নবীজী আরও বলেন

الحَجّ الْمَبْرُورُ لَيْسَ لَهُ جَزَاءٌ إِلّا الجَنّةُ.

মাবরূর (কবুল) হজ্বের প্রতিদান তো কেবল জান্নাতই। সহীহ বুখারীহাদীস ১৭৭৩সহীহ মুসলিমহাদীস ১৩৪৯

কাজেই হজ্ব ফরয হয়ে গেলে তা আদায়ে কোনো মুমিন নানা অজুহাতে কালক্ষেপণ করতে পারে না। মুমিন তো কেবল এই প্রতীক্ষায় থাকে– কবে ‘লাব্বাইক’ বলে হাজিরা দেবে!

তেমনি সামর্থ্যবান ব্যক্তির ওপর কুরবানী করাও ওয়াজিব।

নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন

أُمِرْتُ بِيَوْمِ الْأَضْحَى، جَعَلَهُ اللهُ عِيدًا لِهَذِهِ الْأُمّةِ.

আমাকে ‘ইয়াওমুল আযহা’র আদেশ করা হয়েছে (অর্থাৎ এ দিবসে কুরবানী করার আদেশ করা হয়েছে)এ দিবসকে আল্লাহ তাআলা এ উম্মতের জন্য ঈদ বানিয়েছেন। মুসনাদে আহমাদহাদীস ৬৫৭৫সহীহ ইবনে হিব্বানহাদীস ৫৯১৪সুনানে আবু দাউদহাদীস ২৭৮৯সুনানে নাসায়ীহাদীস ৪৩৬৫

আল্লাহ তাআলা যেহেতু নবীজীকে কুরবানীর হুকুম করেছেন তাই নবীজী আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জনের লক্ষ্যে প্রতি বছর কুরবানী করতেন।

আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. বলেন

أَقَامَ رَسُولُ اللهِ صَلّى اللّهُ عَلَيْهِ وَسَلّمَ بِالمَدِينَةِ عَشْرَ سِنِينَ يُضَحِّي كُلّ سَنَةٍ.

নবীজী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনার দশ বছরের প্রতি বছরই কুরবানী করেছেন। জামে তিরমিযীহাদীস ১৫০৭মুসনাদে আহমাদহাদীস ৪৯৫

যিলহজ্ব মাসের দশ-এগারো-বারো এই তিন তারিখ কুরবানীর দিন। উত্তম হল দশ তারিখেই কুরবানী করা।  অতএব যে ব্যক্তি এ তিন দিনে নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হবেতার জন্য কুরবানী করা ওয়াজিব।

শয়তান বহুভাবে বান্দার আমলের রূহ নষ্ট করে দেওয়ার পাঁয়তারায় থাকে। কোনোভাবেই তাকে প্রশ্রয় দেওয়া চলবে না। একমাত্র আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সন্তুষ্টি লাভের জন্য কীভাবে আমার আমলগুলো নিবেদিত হতে পারে সেদিকে পূর্ণ মনোযোগী হতে হবে। কোনোভাবে যেন কষ্টের আমলগুলো বিনষ্ট না হয়– সে ব্যাপারে সতর্ক থাকি। ইখলাসের সাথে হজ্বকুরবানী আদায় করি। রিয়া ও লোকদেখানো থেকে বিরত থাকি। পাশাপাশি কীভাবে হজ্ব ও কুরবানী আমার ঈমানী যিন্দেগীতে ইতিবাচক প্রভাব সৃষ্টি করতে পারেসেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখি। আল্লাহই একমাত্র তাওফীকদাতা।

আইয়ামে তাশরীক : যে দিনগুলোতে রোযা রাখা হারাম

পূর্বে আইয়ামে তাশরীকে তাকবীর পাঠ করার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ যিলহজ্ব মাসের নয় তারিখ ফজর থেকে নিয়ে তেরো যিলহজ্ব আসর পর্যন্ত (মোট ২৩ ওয়াক্ত) প্রত্যেক ফরয নামাযের পর নারী-পুরুষ সকলের জন্য একবার তাকবীরে তাশরীক বলা ওয়াজিব।

সর্বমোট পাঁচ দিন তাকবীরে তাশরীক বলা হলেও পরিভাষায় সাধারণত এগারোবারো ও তেরো যিলহজ্বকে আইয়ামে তাশরীক বলা হয়।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেনআইয়ামে তাশরীক হল পানাহার ও আল্লাহর যিকিরের জন্য। মুসনাদে আহমাদহাদীস ২০৭২২সহীহ মুসলিমহাদীস ১১৪১

অতএব এ দিনগুলোতে যিকির ও তাকবীর পাঠের ইহতিমাম করার পাশাপাশি রোযা রাখা থেকেও বিরত থাকব। যিলহজ্বের দশ তারিখ থেকে তেরো তারিখ পর্যন্ত রোযা রাখা হারাম।

কুরবানী একমাত্র আল্লাহর জন্য। আল্লাহর নামে যা কুরবানী হবে তা তো আল্লাহরই থাকে। কিন্তু মহান রাব্বুল আলামীন নিজ অনুগ্রহে বান্দার জন্য কুরবানীর পশুর গোশত খাওয়া হালাল করে দিয়েছেনএকে নির্ধারণ করেছেন বান্দার আপ্যায়ন হিসাবে। তাই আইয়ামে তাশরীকে রোযা রাখার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা এসেছেএ যেন সেই মেহমানদারি কবুল করার অপূর্ব সুযোগ!

যিলহজ্বের শিক্ষা কী?

যিলহজ্বের আমলগুলোর দিকে লক্ষ করলে দেখতে পাই যিলহজ্ব আমাদের এ সবকই দিচ্ছে

قُلْ اِنَّنِيْ هَدٰىنِيْ رَبِّيْۤ اِلٰي صِرَاطٍ مُّسْتَقِيْمٍ  دِيْنًا قِيَمًا مِّلَّةَ اِبْرٰهِيْمَ حَنِيْفًا  وَ مَا كَانَ مِنَ الْمُشْرِكِيْنَ قُلْ اِنَّ صَلَاتِيْ وَ نُسُكِيْ وَ مَحْيَايَ وَ مَمَاتِيْ لِلهِ رَبِّ الْعٰلَمِيْنَ لَا شَرِيْكَ لَهٗ  وَبِذٰلِكَ اُمِرْتُ وَ اَنَا اَوَّلُ الْمُسْلِمِيْنَ.

আপনি বলে দিননিশ্চয় আমার রব  আমাকে সরল পথ প্রদর্শন করেছেন, (যা) বিশুদ্ধ ধর্মইবরাহীমের দ্বীনযিনি ছিলেন (আল্লাহর আনুগত্যে) একনিষ্ঠ এবং তিনি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না। আপনি বলুনআমার সালাতআমার ইবাদত (কুরবানী)আমার জীবন ও আমার মরণ জগৎসমূহের প্রতিপালক আল্লাহর জন্য। তাঁর কোনো শরীক নেই। আমি এরই জন্য আদিষ্ট হয়েছি এবং আমি মুসলিমদের একজন। সূরা আনআম (৬) : ১৬১-১৬৩

কাজেই জীবনের প্রতিটি স্তরে সীরাতে মুস্তাকীমের ওপর অবিচল থেকে একনিষ্ঠভাবে মহান রবের সমীপে সমর্পিত হওয়ার শিক্ষাই হচ্ছে যিলহজ্বের শিক্ষা। আসুনযিলহজ্বকে বোঝার চেষ্টা করিহৃদয়ে ধারণ করি এবং সে শিক্ষা অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করি। আল্লাহ তাআলা তাওফীক দান করুন– আমীন।

  • লিখেছেনঃ মুহাম্মাদ আশিক বিল্লাহ তানভীর, লেখকঃ মাসিক আল কাউসার।