২০২৬ বিশ্বকাপের সবচেয়ে আলোচিত রূপকথার গল্পগুলোর একটি লিখছে কেপ ভার্দে। আটলান্টিক মহাসাগরের ছোট্ট এই দ্বীপদেশটি শুধু বিশ্বকাপে প্রথমবারের মতো খেলেই ক্ষান্ত হয়নি, নিজেদের লড়াকু পারফরম্যান্স দিয়ে জায়গা করে নিয়েছে নকআউট পর্বেও। বিশ্বের বড় বড় ফুটবল শক্তির বিপক্ষে তাদের দৃঢ়তা ফুটবলপ্রেমীদের মুগ্ধ করেছে।
কোথায় এই কেপ ভার্দে?
কেপ ভার্দে, যার সরকারি নাম কাবো ভার্দে (Cabo Verde), পশ্চিম আফ্রিকার উপকূল থেকে প্রায় ৬০০ কিলোমিটার দূরে আটলান্টিক মহাসাগরে অবস্থিত ১০টি আগ্নেয় দ্বীপের একটি দ্বীপরাষ্ট্র। দেশটির আয়তন মাত্র প্রায় ৪ হাজার বর্গকিলোমিটার এবং জনসংখ্যা সাড়ে পাঁচ লাখেরও কম। পর্তুগালের উপনিবেশ ছিল দেশটি; ১৯৭৫ সালে স্বাধীনতা লাভ করে। সরকারি ভাষা পর্তুগিজ হলেও স্থানীয়দের মধ্যে কাবোভার্দিয়ান ক্রেওল ভাষাও বহুল প্রচলিত।
প্রাকৃতিক সম্পদ খুব বেশি না থাকলেও পর্যটন, মৎস্য এবং প্রবাসী নাগরিকদের পাঠানো অর্থ দেশটির অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি। সমুদ্রসৈকত, আগ্নেয়গিরি ও বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির জন্য কেপ ভার্দে আফ্রিকার অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্য হিসেবে পরিচিত।
ফুটবলে ধীরে ধীরে উত্থান
‘ব্লু শার্কস’ নামে পরিচিত কেপ ভার্দে কয়েক বছর ধরেই আফ্রিকান ফুটবলে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে। তারা একাধিকবার আফ্রিকা কাপ অব নেশনসে (আফকন) খেলেছে এবং ২০২৫ সালে ইতিহাস গড়ে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের টিকিট নিশ্চিত করে। মাত্র অর্ধমিলিয়নের কিছু বেশি জনসংখ্যার একটি দেশের জন্য এটি ছিল অসাধারণ অর্জন।
বিশ্বকাপে চমকে দেওয়া পারফরম্যান্স
প্রথম বিশ্বকাপেই কঠিন গ্রুপে পড়েছিল কেপ ভার্দে। প্রতিপক্ষ ছিল সাবেক বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেন, দুইবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন উরুগুয়ে এবং সৌদি আরব।
তবু তারা স্পেনের সঙ্গে গোলশূন্য ড্র করে বিশ্বকে চমকে দেয়। এরপর উরুগুয়ের বিপক্ষে ২-২ ড্র এবং শেষ ম্যাচে সৌদি আরবের সঙ্গে ০-০ সমতা করে গ্রুপপর্ব শেষ করে অপরাজিত অবস্থায়। স্পেনের জয়ের ফলে গ্রুপের রানার্সআপ হয়ে তারা ইতিহাসে প্রথমবারের মতো নকআউট পর্বে ওঠে।
বিশ্বকাপের নকআউটে ওঠা সবচেয়ে ছোট জনসংখ্যার দেশ হিসেবে কেপ ভার্দে নতুন ইতিহাসও গড়েছে। এখন শেষ ষোলোতে তাদের প্রতিপক্ষ বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা।
বিশ্বের নতুন ‘আন্ডারডগ’
কেপ ভার্দের সাফল্যের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে শক্তিশালী রক্ষণভাগ, অভিজ্ঞ গোলরক্ষক ভোজিনিয়ার (Vozinha) দুর্দান্ত পারফরম্যান্স এবং কোচ বুবিস্তার কৌশলী পরিকল্পনা। দলটির অনেক খেলোয়াড়ই ইউরোপে জন্ম বা বেড়ে উঠলেও পারিবারিক শিকড়ের টানে জাতীয় দলের হয়ে খেলছেন। সেই বৈচিত্র্যই দলটিকে আরও শক্তিশালী করেছে।
ছোট দেশ হলেও কেপ ভার্দে দেখিয়ে দিয়েছে, ফুটবলে জনসংখ্যা বা ভূখণ্ড নয়—সংগঠিত পরিকল্পনা, প্রতিভা এবং অদম্য মানসিকতাই সবচেয়ে বড় শক্তি। তাই ২০২৬ বিশ্বকাপের সবচেয়ে অনুপ্রেরণাদায়ক গল্পগুলোর একটি হয়ে উঠেছে আটলান্টিকের এই ছোট্ট দ্বীপরাষ্ট্র।