নির্বাচনের মাঠে মজলুমের আর্তনাদ!

Share

রমরমা কাহিনিটি সিনেমার গল্পকেও হার মানাবে। রাজনীতির ময়দানের চক্রান্তের আত্মঘাতী ঘটনাগুলো যে কতটা নির্মম ও নিষ্ঠুর হতে পারে, তার একটা জাতীয় মহড়া হাদি হত্যাকাণ্ডের মাধ্যমে দেখতে পেয়েছি। একটি দুর্ঘটনা ঘটানোর জন্য হত্যাকারীদের পরিকল্পনা কতটা নিখুঁত এবং দুর্ঘটনা ঘটার পর সারা দেশের রাজনীতির হিসাব কিভাবে পাল্টে গেছে তা হয়তো আমরা এখনো কল্পনা করতে পারছি না। কিন্তু আমার মতো যাঁরা ২০১৮ সালের রাতের ভোটের ঝক্কি-ঝামেলা মোকাবেলা করেছেন তাঁরা নিশ্চয়ই হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছেন যে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তিন সপ্তাহ আগে নির্বাচনী মাঠের পরিবেশ পরিস্থিতি কোন পর্যায়ে পৌঁছাবে।
২০২৬ সালের নির্বাচন কেমন হবে এবং নির্বাচনী মাঠে প্রার্থী-নেতাকর্মী এবং ভোটারদের অবস্থা কেমন হবে তা সংক্ষিপ্তাকারে নিবন্ধের শেষ অংশে বর্ণনা করব। কিন্তু তার আগে ২০১৮ সালের নির্বাচনে পটুয়াখালী-৩ আসন অর্থাৎ গলাচিপা ও দশমিনা উপজেলায় কী হয়েছিল তার ভয়াবহ চিত্র আপনাদের কাছে সাধ্যমতো তুলে ধরার চেষ্টা করছি।

বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে যখন নির্বাচনী এলাকায় যাওয়ার চেষ্টা করলাম তখন এমন সব ঘটনা ঘটতে থাকল, যা আমার বাপ-দাদার চৌদ্দগুষ্টিতে ঘটেনি। আমি নিজে সংসদ সদস্য ছিলাম, তার আগে টানা সাত/আট বছর নির্বাচনী এলাকা চষে বেড়িয়েছি দলীয় মনোনয়ন হাসিলে তৃণমূলের নেতাকর্মী এবং সাধারণ ভোটারদের মন জয়ের জন্য।

কাজেই প্রার্থীর দশ বছরের অভিজ্ঞতা, এমপি হিসেবে পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা এবং বিরোধী দলে থাকার আরো পাঁচ বছরসহ দুই যুগের অভিজ্ঞতা দিয়ে বুঝেছিলাম যে নির্বাচনী এলাকা আমার জন্য নিরাপদ। অধিকন্তু কিশোর বয়স থেকে ছাত্ররাজনীতি, এলাকায় সাবেক ও বর্তমান এমপি, মন্ত্রী, চেয়ারম্যান, মেম্বারদের সঙ্গে আত্মীয়তা এবং জানাশোনার সুবাদে এক ধরনের আত্মবিশ্বাস ছিল যে আমার সঙ্গে কেউ সন্ত্রাস করতে আসবে না। অধিকন্তু নির্বাচনী এলাকায় যেসব পুলিশকর্তা, উপজেলা নির্বাহী কর্তাসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা এবং ডিসি-এসপি ছিলেন তাঁরা আমার পূর্ব পরিচিত। ফলে একরকম শতভাগ জয় লাভের স্বপ্ন-বাসনা নিয়ে পুরো পরিবার-পরিজনসমেত হেলেদুলে নির্বাচনী উৎসব করার জন্য যখন ২০১৮ সালের ডিসেম্বর মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহে পটুয়াখালী পৌঁছালাম তখন রাত ১২টা পার হয়ে গিয়েছিল।

একই আসনের সাবেক এমপি প্রয়াত শাহজাহান খান সম্পর্কে আমার মামাশ্বশুর এবং বিগত নির্বাচনে তাঁকে বাদ দিয়ে বিএনপি আমাকে মনোনয়ন দিয়েছিল প্রধানত দুটি কারণে। প্রথমত, এলাকাটি মূলত আওয়ামী লীগের দুর্গ হিসেবে পরিচিত। বিএনপি-জামায়াতের সর্বোচ্চ ভোট সাকল্যে সত্তর হাজার। বিজয়ী আওয়ামী লীগের প্রার্থী পায় এক লাখ থেকে সোয়া লাখ। ফলে বিগত চারটি নির্বাচনে দলীয় প্রতীক নিয়েও জনাব শাহজাহান খান বিজয়ী হতে পারেননি।
এ অবস্থায় আওয়ামী লীগ আমাকে মনোনয়নবঞ্চিত করার পর বিএনপি সংশ্লিষ্ট আসনে প্রার্থী পরিবর্তন করে আমাকে ধানের শীষ প্রতীক বরাদ্দ দেয়। যেহেতু একই পরিবারের মধ্যে নমিনেশন প্রদান করা হয়েছিল সেহেতু মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব থাকলেও দৃশ্যত কোনো ঝামেলা ছিল না। অন্যদিকে আওয়ামী লীগ যাকে মনোনয়ন দিয়েছিল তার সর্বোচ্চ যোগ্যতা ছিল যে সে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের ভাগিনা।

দ্বিতীয়ত, ২০১৮ সালে বিএনপি চরম নাজুক অবস্থায় ছিল। সুতরাং আওয়ামী লীগের একজন আলোচিত সাবেক সদস্যকে দলে ভিড়িয়ে নমিনেশন দেওয়া গেলে শেখ হাসিনার অহমিকার একটি দারুণ রাজনৈতিক জবাব দেওয়া যায় এবং আওয়ামী দুর্গে বিএনপির বিজয় নিশ্চিত করা যায়।

উল্লিখিত অবস্থায় আমার মনোনয়নপ্রাপ্তি জাতীয় দৈনিকগুলোতে গুরুত্ব সহকারে ছাপা হয় এবং নির্বাচনী এলাকায় বেশ সাড়া পড়ে যায়। বিএনপি-জামায়াতের সাধারণ ভোটাররা খুশি হন এবং আওয়ামী লীগের ভোটারদের বিরাট অংশ আমার পক্ষ অবলম্বন করে। ফলে নির্বাচনে বিজয় কিংবা ভোটের মাঠে প্রতিযোগিতা করার মতো কোনো অবস্থাই আওয়ামী লীগের প্রার্থীর ছিল না। এ অবস্থায় রাজনৈতিক কূটচাল, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস এবং পক্ষপাতিত্ব কিভাবে আমার জীবনকে মরণের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে গিয়েছিল সেই কাহিনি শুরু করছি।

পটুয়াখালী শহরে পৌঁছে মামাশ্বশুরের বাসায় উঠলাম এবং রাতের খাবার খাওয়ার সময় জানলাম যে আমাকে গলাচিপা, দশমিনায় ঢুকতে বাধা দেওয়ার জন্য অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের ভাড়া করা হয়েছে এবং জেলা প্রশাসন সন্ত্রাসীদের মদদ দেওয়ায় তারা কয়েক দিন ধরে মাঠে মহড়া দিচ্ছে। আমার মামাশ্বশুর স্থানীয় রাজনীতির অভিজ্ঞ প্রাণপুরুষ এবং পুরো দক্ষিণাঞ্চলে সাহসী মানুষ হিসেবে পরিচিত। তাঁর বড় ছেলে শিপলু খান জেলা যুবদলের শীর্ষ নেতা এবং যথেষ্ট সাহসী, তাদের পরামর্শে আমি ভোররাতে পরিবারের সদস্যদের গ্রামের বাড়ি পাঠিয়ে দিলাম এবং পরের দিন বিকেলে নেতাকর্মীদের নিয়ে নির্বাচনী এলাকায় প্রবেশের সিদ্ধান্ত নিলাম।

ঘটনার দিন দুপুরে চারটি মোটরসাইকেলে করে মোট আটজন পটুয়াখালী থেকে গলাচিপার উদ্দেশে রওনা দিলাম। একটি মোটরসাইকেল চালাচ্ছিলেন স্বয়ং শাহজাহান খান। আর আমার শ্যালক শিপলু আমাকে নিয়ে আরেকটি। বাকি দুটিতে ছিল বিএনপির পরীক্ষিত ও সাহসী চারজন নেতা। আমরা যে পথ দিয়ে এলাকায় ঢুকব সেটির প্রবেশপথে কয়েক অস্ত্রধারী সন্ত্রাসী পাহারা দিচ্ছিল। আমরা অস্ত্রধারীদের তৎপরতার খবর শুনে ভিন্ন পথ ধরলাম এবং সেখানে একই পরিস্থিতির খবর পেয়ে আরো তিন-চারটি পথ পরিবর্তন করে একেবারে সংকীর্ণ এবং অজানা পথ ধরে যখন এলাকায় ঢুকতে যাব অমনি আমাদের অবাক করে দিয়ে কয়েক শ সন্ত্রাসী হারে রে রে করে পথ অবরোধের চেষ্টা করল। আমার মামাশ্বশুরকে তারা ঠেকাতে না পারলেও আমার মোটরসাইকেল ঘিরে ধরার চেষ্টা করল। শ্যালক বলল—ভাইয়া! এখন কী করব? বললাম, ফুল স্পিড, ওদের ওপর মোটরসাইকেল তুলে দাও এবং সে সেটাই করার চেষ্টা করল।

ঘটনার আকস্মিকতায় সন্ত্রাসীরা ডড়কে গেল এবং কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে কিছুটা পিছু হটল। আর সেই সুযোগে আমরা হাতের ডান দিকের রাস্তা ধরে এক শ গজ পার হতেই দেখলাম আমাদের সমর্থকরা দাঁড়িয়ে স্লোগান দিচ্ছে। আমি মোটরসাইকেল থেকে নামা মাত্র নেতাকর্মীরা আশপাশের গাছের ডালপালা, লাঠিসোঁটা নিয়ে সন্ত্রাসীদের ধাওয়া দিল। ফলে ২০১৮ সালের রাতের ভোটের কারিগর সিইসি নুরুল হুদা এবং তাঁর ভাগিনার প্রথম কুকর্ম ভেস্তে গেল।

রাস্তার মোড়ে মোড়ে, হাটবাজার-গঞ্জে সাধারণ মানুষের ঢল নামল এবং অনেকগুলো পথসভা করে যখন রাত ৯টার দিকে বাড়িতে পৌঁছালাম তখন লক্ষ করলাম যে অন্তত বিশ হাজার লোক শীতের রাত উপেক্ষা করে আমার বাড়িতে ভিড় করেছে এবং নির্বাচনী এলাকার প্রবেশপথ থেকে আমার বাড়ি পর্যন্ত আসার যাত্রা পথে অন্তত হাজার দুয়েক মোটরসাইকেল আমার সফরসঙ্গী হয়েছে স্বতঃস্ফূর্তভাবে।

উল্লিখিত অবস্থায় খুশি মনে গভীর রাতে বিছানায় গেলাম। কিন্তু চোখ বন্ধ করার আগেই একের পর দুঃসংবাদে শ্বাস-প্রশ্বাস বন্ধ হওয়ার উপক্রম হলো। নেতাকর্মীদের বাড়ি বাড়ি পুলিশ-র‌্যাব হানা দিল। অনেককে গ্রেপ্তার করল আর সেই ভয়ে রাতের আঁধারে হাজার হাজার নেতাকর্মী বাড়িছাড়া হলো। ফলে সকালবেলার বাস্তবতা দাঁড়াল, আমার বাড়ির সামনে দাঁড়ানোর মতো কোনো সাহসী মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর হয়ে গেল। এভাবে দু-তিন দিন গেল। তারপর ওসি, ইউএনও ও জেলা প্রশাসনের মদদে আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীরা আমার বাড়ির সামনে পাহারা বসাল, আমার সঙ্গে দেখা করতে আসা লোকজনকে মারধর করল এবং অকথ্য ও অশ্রাব্য ভাষায় গালাগাল করে দিনরাত আমার জীবন অতিষ্ঠ করে তুলল। একসময় তারা আমার বাড়ির গেটে তালা ঝুলিয়ে দিল এবং আমি যাতে বাড়ির বাইরে যেতে না পারি সে জন্য অস্ত্র হাতে টহল দিতে থাকল।

আমি সিইসি নুরুল হুদাকে ফোন দিলাম। তিনি ফোন ধরলেন না। ডিসি-এসপি একবার দুবার কথা বললেন বটে, কিন্তু অভিযোগ করায় আমার ওপর জুলুম বাড়িয়ে দিলেন। আমার মামাশ্বশুরকে এলাকাছাড়া করা হলো এবং আত্মীয়-স্বজনের ওপর অত্যাচার বাড়ল। বিএনপির কয়েকজন শীর্ষ নেতাকে ফোন করে জানলাম যে তাঁদের অবস্থা আমার চেয়েও করুণ। এরই মধ্যে সন্ত্রাসীরা আমার বাড়িতে ডাকাতি করার প্রকাশ্য ঘোষণা দিল। তাদের ধারণা, নির্বাচন করার জন্য আমি এক বস্তা টাকা নিয়ে এসেছি। সুতরাং সেই টাকা লুট ও ভাগ-বাটোয়ারার সন্ত্রাসী ফন্দিফিকির শুনে আমার সঙ্গে গৃহবন্দিত্বে থাকা নারী ও শিশুদের মধ্যে কান্নার রোল পড়ে গেল। এত কিছুর পরও আমার ধারণা ছিল—সেনাবাহিনী মাঠে নামালে পরিস্থিতি পাল্টে যাবে। কিন্তু যেদিন সেনাবাহিনী এলো সেদিন থেকে মাঠের পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়ে গেল।

২০১৮ সালের রাতের ভোটের উল্লিখিত ঘটনা মনে পড়ল সাম্প্রতিক কালের দুটো ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে। প্রথমটি হলো ডেইলি স্টার ও প্রথম আলো অফিসে যখন আগুন ধরিয়ে দেওয়া হলো এবং ইতিহাসের জঘন্যতম মব তৈরি করে উক্ত ভবনে আটকে পড়া সাংবাদিকদের জ্বলন্ত চিতায় পুড়িয়ে মারার আতঙ্কে মৃত্যুপথযাত্রী করা হলো, তখন আক্রান্তদের অনুভূতি কেমন ছিল তা ভাবতে গিয়ে আমার নিজের দুর্দশার কথা স্মরণ হলো। দ্বিতীয়ত : বিভিন্ন দলের মনোনয়ন নিয়ে মন্ত্রী-এমপি হওয়ার জন্য যাঁরা মাঠ দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন তাঁরা বিরূপ পরিস্থিতিতে কিরূপ সংকটে পড়বেন তা নিয়ে চিন্তা করতে গিয়ে ২০১৮ সালের রাতের ভোটের বিষময় স্মৃতি সামনে চলে এলো।
আমরা আজকের নিবন্ধের একদম শেষ পর্যায়ে চলে এসেছি। এবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে আমার শঙ্কার কথা বলব। আমার দৃষ্টিতে ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের একতরফা, ত্রুটিপূর্ণ এবং বিতর্কিত নির্বাচনের সময়ও রাষ্ট্রের যে সংহতি ছিল—জনগণের মধ্যে যে সাহস, শক্তি ছিল এবং সমাজ ও রাষ্ট্রে যে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও ভাবধারা ছিল, তা বর্তমানে তলানিতে পৌঁছে গেছে। ফলে কোনো বিরূপ পরিস্থিতি মোকাবেলার সামর্থ্য আমাদের কারো নেই এবং এই কারণেই দিপু দাসকে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা, হাদিকে গুলি করে মেরে ফেলা অথবা দেশের বৃহৎ সংবাদপত্র অফিসে ভাঙচুর, লুটপাট ও আগুন ধরিয়ে দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে। এ অবস্থায় নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসবে ততই সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে এবং বিপদগ্রস্তরা ভয় ও আতঙ্কে দিশাহারা হয়ে পড়বে।

লেখক : গোলাম মাওলা রনি
দৈনিক কালের কণ্ঠ
ডিসেম্বর ২৪, ২০২৫