এটা কি কেবলমাত্র কিশোর অপরাধ! নাকি সমাজের গভীর ক্ষত!

Share

সন্তানের জন্য বাবা-মায়ের ভালোবাসা আদর চেষ্টার কি কমতি থাকে কখনো! থাকে না। সন্তানের জন্য বাবা-মায়ের পরিশ্রমের বিনিময়মূল্য হয় কি কখনো! হয় না। মায়ের একধার দুধের দাম সন্তানের শরীরের চামড়া দিয়ে জুতা বানিয়ে দিলেও নাকি শোধ হয় না। বাবার পরিশ্রম আর হৃদয়ের গভীরে লুকানো ভালোবাসা সন্তানের প্রতিটি পদক্ষেপে তাকে গভীরভাবে আগলে রাখে, সন্তান হয়তো সেটা টেরও পায় না। বাবামায়ের এইযে যুগলবন্দী ত্যাগ এই নিয়েইতো সন্তানের বেড়ে ওঠা। পৃথিবীর ক’জন বাবা-মা সন্তানের মঙ্গলের চিন্তা বাদ দিয়ে নিজের জন্য ভাবে…! ভাবে না। সন্তান বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন হোক আর সাধারণ শিশু। জীবনের প্রতিটি রক্তবিন্দু দিয়ে সব বাবা-মা সন্তানের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ প্রত্যাশা করে। নিজের জন্য ভালো কিছু কেনা বা খাওয়ার আগে বহুবার জিজ্ঞেস করে নিজেকে এটাতো আমার সন্তানের পছন্দ, আমার জন্য না নিয়ে সন্তানের জন্য নেই। বাবা-মা এমনই। পৃথিবীতে প্রায় সব বাবা-মা নিজের সর্বস্ব দিয়ে সন্তানের জন্য চেষ্টা করে যাচ্ছেন। আমিও। সেটা নিয়ে খেদ নেই। খেদ অন্য জায়গায়। সেই সন্তানের জন্য বাবা-মাকে যদি কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হয় তখন বিষয়টা গভীর ক্ষত তৈরি করে। বাবা-মা কি ওই সন্তানকে বলেছে অন্যায়টা করতে!? বলেনি। বলতে পারেন না। তাহলে বাবা-মাকে কেনো দায়টা নিতে হবে!? শুধু জন্ম দিয়েছেন বলে!? হ্যাঁ, জন্ম দেয়ার সাথে তার যোগসূত্র আছে বৈকি কিন্তু তাই বলে শুধু জন্ম দেয়ার সাথে ওই সন্তানের অন্যায় বা অপরাধে জড়িয়ে পড়ার সম্পর্ক খুঁজতে যাওয়া বোকামি। অনুচিত!

আমার কিশোর বয়সে দেখেছিলাম, মৃত বাবাকে সমাহিত করতে দিচ্ছে না সন্তান। সে মেয়ে সন্তান ছিলো। তার অভিযোগ বাবা তাকে তার প্রাপ্য সম্মান দেয়নি। মানে জমাজমি সব ছেলেদের নামে দিয়েছেন। সেই কারণে সে তার বাবার লাশ কবরে নিতে দিচ্ছে না। বর্তমান সমাজেও এমন ঘটনার খবর আমরা দেখি। বৃদ্ধ বাবা-মাকে নিগৃহীত করার ভিডিও এখন প্রায়ই ভেসে আসে মোবাইল স্ক্রিনে। কিন্তু বাবা-মা সন্তানকে বিপদের মধ্যে ফেলে চলে যায় এমন ঘটনা খুব কম।

“গত বৃহস্পতিবার বিকেলে মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার বনপারিল গ্রামের সৌদিপ্রবাসী দুদল মিয়ার মেয়ে আতিকা আক্তার (৭) নিখোঁজ হয়। এরপরই পরিবারের পক্ষ থেকে এলাকায় মাইকিং করা হয় এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে শিশুটির খোঁজ করতে থাকেন স্বজনেরা। এর মধ্যে আতিকাকে একই গ্রামের এক কিশোরের (১৫) সঙ্গে দেখেছে বলে স্বজনদের জানায় এক শিশু। এরপর কিশোরকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করে আতিকার স্বজনেরা। পরে রাত ১০টার দিকে ওই কিশোরের দেওয়া তথ্যমতে, বাড়ির পাশের একটি ভুট্টাখেতে গলায় কাপড় প্যাঁচানো অবস্থায় আতিকার লাশ দেখতে পান স্বজন ও স্থানীয় লোকজন। এ ঘটনায় নিহত শিশুর লাশ বাড়িতে নিয়ে যান স্বজন ও স্থানীয় লোকজন। এর মধ্যে অভিযুক্ত কিশোর পালিয়ে যায়। তবে কিশোরের বড় ভাই নাজমুলকে আটক করে নিহত শিশুর স্বজন ও স্থানীয় লোকজন। এরপর কিশোরের বাবা পান্নু, চাচা ফজলুকে নিহত শিশুর বাড়িতে ডেকে আনা হয়। রাত ১১টার দিকে নিহত শিশুর বিক্ষুব্ধ স্বজন ও স্থানীয় লোকজনের পিটুনিতে পান্নু ও ফজলু মারা যান। পরে তাঁদের লাশ বাড়ির পাশে একটি পুকুরের পানিতে ফেলে দেওয়া হয়। এ ঘটনায় গুরুতর আহত হন নাজমুল। খবর পেয়ে রাত ১২টার দিকে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে আহত নাজমুলকে উদ্ধার করে জেলা সদরের ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে পাঠায়। পাশাপাশি নিহত শিশু আতিকা এবং পান্নু ও ফজলুর লাশ উদ্ধার করে ময়নাতদন্তের জন্য মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য নাজমুলকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। শনিবার দুপুরে শিশুকে হত্যার ঘটনায় সদর থানায় একটি হত্যা মামলা হয়েছে। তবে অভিযুক্ত কিশোরের বাবা ও চাচাকে হত্যার ঘটনায় থানায় আজ বেলা দুইটা পর্যন্ত কোনো মামলা হয়নি। শিশুকে হত্যার অভিযোগে কিশোরকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। মামলায় পাঁচজনকে আসামি করা হয়েছে। আসামিরা হলেন সদর উপজেলার বনপারিল গ্রামের অভিযুক্ত কিশোর, কিশোরের বাবা নিহত পান্নু মিয়া (৪৫), চাচা নিহত ফজলু মিয়া (৩০) ও ভাই আহত নাজমুল হোসেন (২৪) এবং একই গ্রামের মো. রনি (২২)”
-সূত্র: প্রথম আলো।

এই মর্মান্তিক ঘটনার সূত্রপাত একজন কিশোর অপরাধী। সে নিহত পান্নু মিয়ার সন্তান। এই কিশোরের অপরাধের শিকার তার বাবা চাচা বড়ো ভাই প্রতিবেশী। এদের মধ্যে বাবা চাচা অলরেডি মরে গেছে। ভাই মৃত্যুর সাথে পাঞ্জা লড়ছে। পান্নু ফজলু মিয়ার মৃত্যুটা কি স্বাভাবিক মৃত্যু!? কখনো না। যে কিশোর অপরাধ করেছে তার অপরাধের মাত্রা কতটা ভয়াবহ বিপদ সংকেত আমাদের সমাজের রাষ্ট্রের জন্য সেটা বিবেচনায় নিতে হবে সবার আগে। তার চেয়েও বড় অপরাধ আমরা করে বসে আছি। সবাই মিলে অপরাধীর বাবা চাচাকে হত্যা করেছি। বিচারের সুযোগ না দিয়ে। এভাবে চলবে আমাদের সমাজ রাষ্ট্র!? কতদিন?

আমাদের এই সব ভয়াবহতার ভিতরেও বাঁচার চেষ্টা করতে হচ্ছে। রাষ্ট্র কবে আমাদের জন্য নিরাপদ আশ্রয়স্থল হবে!? একটা অপরাধ সংগঠিত হলে সেটার সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত না করে অন্য হাজারটা অপরাধের জন্ম দিচ্ছি আমরা! কেনো!? আবার এমন ভয়াবহ ঘটনার পোস্ট করছি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে “আলহামদুলিল্লাহ, জনতার আদালতে কঠিন বিচার দেখলো দেশ।” এগুলো মেনে নেয়া যায় না। আমি ওই কিশোর অপরাধী ছেলেটার পক্ষ নিয়ে আরও একটি অপরাধ করতে চাই না। আমি চাই কিশোরটির যেনো সর্বোচ্চ শাস্তি হয়, কেনো সে এতো ছোট বয়সে এমন অপরাধে জড়িয়ে পড়ার সাহস পেলো। পাশাপাশি যারা তার বাবা চাচাকে পিটিয়ে হত্যা করলো তাদেরকেও বিচারের আওতায় এনে সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করে জাতিকে দায়মুক্ত করা, যেনো অপরাধ করে কেউ পার না পায়।।

এস এম হুমায়ুন কবির
নির্মাতা ও জ্যেষ্ঠ চিত্র-সম্পাদক, অনুষ্ঠান বিভাগ, বাংলাভিশন